ইরানের ১৮ বন্দির মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৫ এএম

ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানের দাস্তগের্দ কারাগারে অস্থিরতা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৮ বন্দি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন। ইরান ইন্টারন্যাশনালের হাতে আসা একটি বিচারিক নথির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, মামলাটি ইরানের বিপ্লবী আদালতে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ‘অস্থিরতায় নেতৃত্ব দেওয়া’ এবং ‘যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ডে উসকানি দেওয়ার’ মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগে দেশটির আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

বিচারিক নথিতে মোট ৭৫ বন্দিকে এ মামলার আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ইসফাহানের প্রসিকিউটর কার্যালয় অন্তত ২৬ জনের বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছে। নথিতে থাকা অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৮ জনের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিমান হামলার পর অস্থিরতা

দাস্তগের্দ কারাগারটি ইসফাহান কেন্দ্রীয় কারাগার নামেও পরিচিত। গত মার্চে কারাগারের কাছে একটি বিমান হামলার পর সেখানে অস্থিরতা ও আগুনের ঘটনা ঘটে।

কারাগারের পেছনে থাকা একটি সামরিক ঘাঁটি ও গোলাবারুদের গুদামে হামলা হয়। এতে কারাগারের কিছু অংশ এবং বন্দিদের আবাসিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর বিস্ফোরণের শব্দ ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় কারাগারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারাগারের কিছু প্রহরী ও কর্মকর্তা কয়েকটি অবস্থান ছেড়ে চলে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়েছে। নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ চেয়ে কয়েকজন বন্দি নিজেদের ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে আসেন।

পরে কিছু বন্দি কম্বল, চাদর ও অন্যান্য সামগ্রীতে আগুন ধরিয়ে দেন বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি। তাদের অভিযোগ, বন্দিরা কারাগারের দরজা খুলে দিয়ে নিরাপদ এলাকায় যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এ কাজ করেছিলেন। আগুন ছড়িয়ে পড়লে আবদ্ধ করিডরগুলো ধোঁয়ায় ভরে যায়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আরও দাবি, পরে নিরাপত্তা বাহিনী কারাগারে প্রবেশ করে বন্দিদের ওপর গুলি, ছররা গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তারা বলেছে, কয়েকজন বন্দি গুলিতে নিহত হন। অন্যরা আগুনে পুড়ে অথবা ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টের কারণে মারা যান। এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

গুরুতর অভিযোগ

বিচারিক নথি অনুযায়ী, প্রসিকিউটররা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে ‘মানুষকে যুদ্ধ ও পারস্পরিক হত্যাকাণ্ডে উসকানি’, ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ, জনসাধারণের ব্যবহৃত স্থাপনা ও সরঞ্জাম ধ্বংস এবং যুদ্ধকালীন সময়ে দাঙ্গায় পরিণত হওয়া অবৈধ কারাগার সমাবেশে অংশ নেওয়ার মতো অভিযোগ এনেছেন।

এ ছাড়া কারাগারের নজরদারি ক্যামেরা, জানালা ও নিরাপত্তা দরজা ধ্বংস, সম্পত্তি নষ্ট করতে সহযোগিতা এবং কারাগারের চিকিৎসাকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারা এ ধরনের অভিযোগের মুখে থাকা ১৭ বন্দির পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে। নথিতে অবশ্য ১৮ বন্দির মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।

একই কারাগারে আগেও মৃত্যুদণ্ড

নতুন মামলাটি এমন সময়ে বিপ্লবী আদালতে পাঠানো হলো, যখন দাস্তগের্দ কারাগারে আটক পাঁচ প্রতিবাদকারীকে পৃথক ‘আলিখানি স্কয়ার’ মামলায় গত দুই মাসে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ওই মামলায় আরও পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড ও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের ব্যবহার বেড়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও জানিয়েছে, জানুয়ারির বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে বিপ্লবী আদালতগুলোতে একাধিক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং আরও বহু মানুষ মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

কারাগারের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ

দাস্তগের্দ কারাগারে বন্দিদের চিকিৎসা ও আচরণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

রাজনৈতিক বন্দি আবদোলরাসুল মোর্তাজাভি জুনে কারাগার থেকে পাঠানো একটি অডিও বার্তায় অভিযোগ করেন, জানুয়ারির বিক্ষোভে আটক কয়েকজনকে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি বন্দিদের মারধর, কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা এবং বাইরে ব্যায়াম বা হাঁটার সুযোগ সীমিত করার অভিযোগও করেন।

এদিকে ইরান ইন্টারন্যাশনাল সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কারাগারটির স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতির খবর পাওয়ার দাবি করেছে। তাদের প্রতিবেদনে কারাগারে মেনিনজাইটিস ছড়িয়ে পড়ার কথাও বলা হয়েছে। আগস্টে পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে তারা জানায়, সংক্রামক রোগে কয়েকজন বন্দির মৃত্যু হয়েছে এবং কারাগারের বিভিন্ন ওয়ার্ডে মেনিনজাইটিস ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকজন বন্দিকে ইসফাহানের আল-জাহরা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

তবে এসব স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দাস্তগের্দ কারাগারে নতুন করে ১৮ বন্দির মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকির খবর ইরানে চলমান মৃত্যুদণ্ড ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে কারাগারের অস্থিরতা, অগ্নিকাণ্ড এবং পরবর্তী নিরাপত্তা অভিযানের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে স্বাধীন তদন্তের সুযোগ না থাকায় বন্দিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন