তাহলে কী ইরানে বড় বিমান হামলা আসছে?

ইসরায়েলের জন্য ২ হাজার পাউন্ড ওজনের ৪০ হাজার ভারী বোমার একটি বড় অস্ত্র প্যাকেজ প্রস্তুত করছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলারের এই প্যাকেজ নিয়ে এরই মধ্যে মার্কিন কংগ্রেসে অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। একই সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠায় প্রশ্ন উঠেছে এই বিপুল পরিমাণ ভারী বোমার গন্তব্য কি সম্ভাব্য নতুন ইরান অভিযানের দিকে?

তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এমন কোনো মার্কিন বা ইসরায়েলি ঘোষণা নেই যে এসব বোমা ইরানে নতুন বিমান হামলার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ফলে অস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনা এবং ইরানে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করা এখনই নিশ্চিত নয়।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ২.৮ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজে রয়েছে ২ হাজার পাউন্ডের ৪০ হাজার বোমা। এর মধ্যে ২০ হাজার MK-84 এবং ২০ হাজার BLU-117। এগুলো সাধারণত বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও ধ্বংসক্ষমতার জন্য ব্যবহৃত ভারী প্রচলিত বোমা।

২ হাজার পাউন্ডের একটি বোমার ওজন প্রায় ৯০৭ কেজি। ফলে ৪০ হাজার বোমার মোট ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ হাজার টন। এত বিপুল পরিমাণ ভারী বোমার সরবরাহ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের জন্য অন্যতম বড় মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও ২০ হাজার I-2000 penetrator-সহ মোট ৬০ হাজার ২ হাজার পাউন্ড শ্রেণির যুদ্ধাস্ত্রের সম্ভাব্য প্যাকেজের কথা বলা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত অন্যান্য প্রতিবেদনে আপাতত ৪০ হাজার MK-84 ও BLU-117-এর কথা নিশ্চিতভাবে এসেছে। ফলে প্যাকেজের চূড়ান্ত কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে পার্থক্য রয়েছে।

এই ধরনের বোমা বড় স্থাপনা, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতা প্রয়োগের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। BLU-117 ও MK-84 উভয়ই ২ হাজার পাউন্ড শ্রেণির প্রচলিত বোমা; এগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভুল নির্দেশনা ব্যবস্থা যুক্ত করা সম্ভব।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই শ্রেণির বোমা শুধু আকাশ থেকে সাধারণ স্থাপনায় হামলার জন্য নয়—উপযুক্ত কনফিগারেশনে শক্তিশালী বা সুরক্ষিত স্থাপনার বিরুদ্ধেও ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে। এ কারণেই ইসরায়েলের হাতে বিপুল পরিমাণ এমন অস্ত্র যাওয়ার বিষয়টি সামরিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে।

ইরানকে ঘিরে প্রশ্নটি উঠছে মূলত বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাত কয়েক মাস ধরে চলছে। সেপ্টেম্বরেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে হুমকি-পাল্টা হুমকি দেখা দিয়েছে। ইরানের সামরিক নেতৃত্ব নতুন হামলা হলে কঠোর পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের জন্য বিপুল পরিমাণ ভারী বোমা সরবরাহের পরিকল্পনা স্বাভাবিকভাবেই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানের প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো বা ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।

তবে এসব বোমা নির্দিষ্টভাবে ইরানে ব্যবহারের জন্য পাঠানো হচ্ছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে নেই। বরং মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অস্ত্র প্যাকেজটিকে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বৃহত্তর ধারার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই অস্ত্র প্যাকেজকে শুধু ইরানকে কেন্দ্র করে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ২ হাজার পাউন্ডের বোমা সরবরাহ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কের বড় কারণ হলো গাজা ও লেবাননে এর সম্ভাব্য ব্যবহার।

২০২৪ সালে তৎকালীন বাইডেন প্রশাসন গাজায় বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কার মধ্যে ইসরায়েলের জন্য কিছু ২ হাজার পাউন্ডের বোমার চালান স্থগিত করেছিল। পরে ট্রাম্প প্রশাসন সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে এবং ইসরায়েলের জন্য নতুন অস্ত্র সরবরাহ এগিয়ে নেয়।

এবারের প্রস্তাবিত প্যাকেজ নিয়েও মার্কিন কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট গ্রেগরি মিক্স অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর উদ্বেগের একটি বিষয় হলো, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এসব অত্যন্ত শক্তিশালী যুদ্ধাস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করা হবে।

অন্যদিকে, বিপুল অস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনাটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার ও প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

মার্কিন কংগ্রেসের বাজেট অফিসের (CBO) হিসাবে, ২০২৬ সালের ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সংস্থাটি বলেছে, যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোলাবারুদের মজুত কমেছে এবং তা পুনরায় পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তবে পেন্টাগন এই ঘাটতির মূল্যায়নের সঙ্গে দ্বিমত জানিয়েছে এবং বলেছে, প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

অর্থাৎ একদিকে ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ ভারী বোমা দেওয়ার পরিকল্পনা, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের চাপ দুটি বিষয় একই সময়ে সামনে এসেছে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে সতর্ক উত্তর হলো সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু ৪০ হাজার বোমার পরিকল্পনাকে নতুন ইরান বিমান হামলার নিশ্চিত সংকেত বলা যাচ্ছে না।

কারণ, অস্ত্রের ব্যবহার নির্ভর করবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যুদ্ধের পরিস্থিতি, ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর। আবার এত বিপুল অস্ত্র একবারে সরবরাহ করা হলেও সেগুলো বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন সামরিক অভিযানে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে ইরান যুদ্ধ যখন দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে হুমকি-পাল্টা হুমকি চলছে, তখন ইসরায়েলের হাতে ২ হাজার পাউন্ড শ্রেণির বিপুলসংখ্যক বোমা পৌঁছানো মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ সংঘাতের মাত্রা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।