ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব সুক্কত উপলক্ষে অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রবেশপথগুলো এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপরও আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) সেনাবাহিনীর সুপারিশের ভিত্তিতে এই নির্দেশ দেন। নিষেধাজ্ঞা শনিবার পর্যন্ত বহাল থাকার কথা।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের চলাচল এমনিতেই শত শত ইসরায়েলি চেকপয়েন্ট, সড়কগেট ও অন্যান্য বাধার কারণে সীমিত। নতুন করে কড়াকড়ি আরোপের ফলে পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ এবং পশ্চিম তীরের হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানে যাতায়াতও আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (OCHA) অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ৩০০টিরও বেশি চেকপয়েন্ট রয়েছে। এগুলো ছাড়াও ফিলিস্তিনিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে আরও শত শত সড়কগেট, মাটির বাঁধ, সড়ক অবরোধ ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শহর ও প্রধান সড়কের মধ্যে চলাচল নিয়ন্ত্রণে এসব চেকপয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে কালানদিয়া চেকপয়েন্ট রামাল্লাহ ও পূর্ব জেরুজালেমের মধ্যে অন্যতম প্রধান পারাপারপথ। একসময় পশ্চিম তীর ও ইসরায়েলের মধ্যে মোট চলাচলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে হতো।
চেকপয়েন্ট ৩০০ বেথলেহেম ও জেরুজালেমের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। পূর্ব জেরুজালেমসহ মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে কাজ করা ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি অন্যতম প্রধান পারাপারপথ।
উত্তরাঞ্চলে রয়েছে আইয়াল চেকপয়েন্ট, যা কালকিলিয়া ও আশপাশের এলাকার মানুষের চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ। তাইয়েবেহ চেকপয়েন্ট তুলকারেমের দক্ষিণে এবং তারকুমিয়া চেকপয়েন্ট হেবরনের কাছে অবস্থিত।
চেকপয়েন্টে কী হয়?
চেকপয়েন্টে ফিলিস্তিনিদের পরিচয়পত্র ও যানবাহন পরীক্ষা করা হয়। কোথাও নিয়মিত সেনা সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন, আবার কিছু চেকপয়েন্ট নির্দিষ্ট সময়ে চালু থাকে। কোনো কোনো সড়কগেট প্রায়ই বন্ধ রাখা হয়।
ফলে একটি শহর থেকে অন্য শহরে যেতে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হয়। এর প্রভাব পড়ে কর্মস্থলে যাতায়াত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ওপরও।
সেপ্টেম্বরে আল জাজিরার আরেক প্রতিবেদনে পশ্চিম তীরের চেকপয়েন্ট ও সামরিক বাধার অর্থনৈতিক প্রভাবের কথাও তুলে ধরা হয়। নাবলুস এলাকায় ১৪টি সামরিক চেকপয়েন্ট পর্যবেক্ষণ করে এক গবেষণায় দেখা যায়, অপেক্ষার সময় ১৫ থেকে ৫০ মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। কিছু যাত্রায় গড়ে ৪২ মিনিট পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগছে।
কর্মসংস্থানেও প্রভাব
ইসরায়েলে কাজের অনুমতি পাওয়া পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের চলাচলও এসব বিধিনিষেধের কারণে ব্যাপকভাবে সীমিত হয়েছে। গাজা যুদ্ধ শুরুর আগে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি নিয়োগকর্তাদের অধীনে কাজ করতেন। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে সেই সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার ৩০০-তে নেমে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সুক্কত উপলক্ষে চলমান এক সপ্তাহের সামরিক বন্ধের কারণে এখন এমন ফিলিস্তিনিরাও ইসরায়েল বা ইসরায়েলি বসতিতে কাজে যেতে পারছেন না, যাদের বৈধ ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে। কেবল জরুরি হিসেবে বিবেচিত শ্রমিকদের পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি শিল্পাঞ্চলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
ফলে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য চেকপয়েন্ট শুধু নিরাপত্তা তল্লাশির স্থান নয়; এগুলো তাদের দৈনন্দিন চলাচল, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও গুরুত্বপূর্ণ সেবায় প্রবেশের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে সুক্কত উপলক্ষে সামগ্রিক সামরিক বন্ধের কারণে এই বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা।