মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এশীয় লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সময় ভোরের দিকে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্স ৬৩ সেন্ট বা ০.৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৯১ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৭২ সেন্ট বা ০.৮ শতাংশ বেড়ে ৯৩ দশমিক ৩২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ নিয়ে অব্যাহত উদ্বেগকে দেখা হচ্ছে। যদিও অঞ্চলটির কয়েকটি বড় তেল উৎপাদক দেশ থেকে রপ্তানি বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে পরিবহনব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ফলে বাজারে সরবরাহ নিয়ে ঝুঁকি রয়ে গেছে।
কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদক দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক ১ কোটি ২৮ লাখ ব্যারেলে উঠেছে। ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর পর এটি সর্বোচ্চ মাত্রা। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাড়তি চালান রপ্তানি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে রপ্তানি বাড়লেই যে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে গেছে, তা নয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিছুটা বাড়লেও যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় তা এখনো কম। অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মতো বিকল্প ও বেশি ব্যয়বহুল পদ্ধতি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং সরবরাহব্যবস্থায় অদক্ষতা তৈরি হচ্ছে।
বর্তমান তেলবাজারের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের জায়গা হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে সামরিক উত্তেজনা বা দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে এই পথে জাহাজ চলাচল বাড়লেও তা এখনো আগের মাত্রায় ফেরেনি।
ফলে বাজারে একটি দ্বৈত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ থেকে তেল রপ্তানি বাড়ছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। এই দুই বিপরীত প্রবণতার মধ্যেই তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে।
তেলের বাজার এখন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক তৎপরতার দিকেও তাকিয়ে আছে। সোমবার দুই দেশের কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন। আলোচনার লক্ষ্য সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটানো। নতুন আলোচনায় ইরানের সংশোধিত সাত দিনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ইরানের প্রস্তাবের মধ্যে যুদ্ধবিরতি, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড়, তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয় রয়েছে। এর বিনিময়ে তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছে।
এ কারণে কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে তেলের বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে। বিপরীতে আলোচনা ব্যর্থ হলে বা হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে দাম আরও চাপে পড়তে পারে—এমন ঝুঁকি বাজারে বিবেচনায় রয়েছে।
রয়টার্সের বাজার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য একটি সমঝোতার আশা এখনো ব্রেন্টের দামকে আরও দ্রুত ওপরে ওঠার ক্ষেত্রে কিছুটা বাধা দিচ্ছে। অর্থাৎ বাজারে একদিকে যুদ্ধের কারণে সরবরাহঝুঁকি, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা—দুই ধরনের সংকেতই কাজ করছে।
অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকায় এর প্রভাব শুধু তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর নয়, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে থাকায় পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও জ্বালানি ব্যয় নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রশাসন ডিজেল বিক্রির নিয়ম শিথিল করার মতো কিছু পদক্ষেপ বিবেচনা করছে, যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো যায়।
ফলে বর্তমান তেলবাজারের পরিস্থিতি শুধু সরবরাহ ও চাহিদার হিসাব নয়; এর সঙ্গে যুদ্ধ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক আলোচনাও সরাসরি যুক্ত।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎই এখন আন্তর্জাতিক তেলের দামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিগুলোর একটি। কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি হলে সরবরাহঝুঁকি কমতে পারে; আর সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাজারে অস্থিরতাও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
'বিশ্বজুড়ে মার্কিনদের যেখানে স্বার্থ আছে সেখানেই হামলা করবে ইরান'
মধ্যরাতে ছাপাখানায় শিক্ষামন্ত্রী