রায়িসির কারাদণ্ডে গালিবাফ-এজেই'র বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে কট্টরপন্থীরা

কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য হামিদ রায়িসির কারাদণ্ডকে কেন্দ্র করে ইরানের রক্ষণশীল শিবিরে বিভাজন আরও প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। রায়িসিকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ-বাকের গালিবাফ ও প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেইর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। অন্যদিকে রক্ষণশীল শিবিরের আরেক অংশ রায়িসির সমর্থকদের সমালোচনা করে বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

অনলাইনে অনুষ্ঠিত এক সংসদীয় অধিবেশনে রায়িসি বলেন, গালিবাফ, সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবালয় কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। এসব অভিযোগের একটির ভিত্তিতেই তাকে ১০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। রায়িসি রায়টিকে বেআইনি ও রাজনৈতিক বলে আখ্যা দিলেও সাজা ভোগ করতে কারাগারে যাওয়ার কথা বলেন।

রায়িসি জানান, তার বিরুদ্ধে মামলাটি তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার আগের। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়েছিল। ওই সময় তিনি সাপ্তাহিক পত্রিকা ৯ দের পরিচালনা করতেন। গালিবাফকে নিয়ে প্রকাশিত ওই নিবন্ধের শিরোনাম ছিল সংসদীয় নথিতে গালিবাফের কারসাজি।

ইরানের বিচার বিভাগ জানায়, রায়িসি তেহরানের বিশেষ ধর্মীয় আদালতে হাজির হন এবং একই দিন তাকে এভিন কারাগারের ধর্মীয় অপরাধীদের জন্য নির্ধারিত অংশে পাঠানো হয়। বিচার বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, গালিবাফের কাছে ক্ষমা চেয়ে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য রায়িসির হাতে ১৮ মাসেরও বেশি সময় ছিল।

তেহরান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচনে রায়িসি তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। ওই নির্বাচনের সময় রাজধানীতে ভোট দেওয়ার যোগ্য প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভোট বর্জন করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে কারাগারে যাওয়া তিনিই প্রথম বর্তমান সংসদ সদস্য।

রায়িসির সাজায় কট্টরপন্থীদের ক্ষোভ

রায়িসির সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, সমালোচকদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতেই গালিবাফ তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তাদের দাবি, দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়ার বদলে গালিবাফ একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে পুরোনো মামলা এগিয়ে নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

এই শিবিরের সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিক ও গণমাধ্যমগুলো প্রধান বিচারপতি মোহসেনি-এজেইর বিরুদ্ধেও সমালোচনা শুরু করেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি সরকারপন্থী রাতের সমাবেশেও এই বিরোধের প্রতিফলন দেখা গেছে।

কোমের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ-মানান রায়িসি, যিনি দুই বছর আগে সাঈদ জলিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারের স্থানীয় দায়িত্বে ছিলেন, গালিবাফসহ কয়েকজন কর্মকর্তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণ হয়তো এসব কর্মকর্তাকে মসজিদ, সমাবেশ, জনসমাগম বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দেবে না এবং তারা জনরোষের মুখে পড়তে পারেন।

পায়দারি পার্টির সঙ্গে যুক্ত এবং রাজা নিউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেইসাম নিলিও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে পক্ষপাত ও অবিচারের অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, এই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান সংগঠিত করা হচ্ছে।

কট্টরপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী মোহসেন মাকসুদি রায়িসির কারাদণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তোলেন, জাতীয় স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করা সম্ভব হলে এবং অপমান ও আগ্রাসনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আলোচনার পক্ষে থাকা গেলে জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে তিন বছর আগের একটি সংবাদপত্রের শিরোনামকে ঘিরে দায়ের করা অভিযোগ প্রত্যাহার করা যায় না কেন।

রক্ষণশীলদের একাংশের পাল্টা অবস্থান

তবে রায়িসির সমর্থকদের তৎপরতার বিরোধিতা করেছেন রক্ষণশীল শিবিরের অন্য অংশের নেতারা। আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে রায়িসির বক্তব্যের সমালোচনা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে তার আপত্তিগুলোকে বিচারিক রায়ের বিরুদ্ধে অপবাদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, রায়িসি রায়টিকে অস্বাভাবিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী বলে প্রশ্ন তুলেছেন এবং একই সঙ্গে এটিকে রাজনৈতিক ও বেআইনি বলে আখ্যা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমটি তার বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম তাবনাক একটি রাতের সমাবেশের ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে কট্টরপন্থীদের রায়িসির পক্ষে এবং গালিবাফের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়। তাবনাক ওই ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করে, অল্পসংখ্যক মানুষ এসব সমাবেশকে নিজেদের গোষ্ঠীগত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এগিয়ে নিতে ব্যবহার করছে।

রক্ষণশীল সংবাদপত্র খোরাসান বলেছে, গালিবাফের কাছে ক্ষমা চাইতে রায়িসির অস্বীকৃতির কারণেই আদালত মনে করেছে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে অনুতপ্ত নন। একই সঙ্গে মামলাটি নিষ্পত্তির নির্দেশও তিনি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে সংবাদপত্রটি দাবি করেছে।

সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য মোজতবা জারেই সতর্ক করেছেন, যুদ্ধের সময় একটি বিচারিক মামলাকে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমকেন্দ্রিক সংঘাতে পরিণত করলে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন আরও বাড়বে।

রক্ষণশীল শিবিরে বিরোধ আরও বিস্তৃত

রায়িসির কারাদণ্ডের ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ নিরসনে আলোচনা এবং ইসলামাবাদ সমঝোতায় ফেরার পক্ষে থাকা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধেও কট্টরপন্থীদের আক্রমণ বেড়েছে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির বাড়ির বাইরে কট্টরপন্থীরা সমাবেশ করেছে এবং তাকে পশ্চিমের প্রতি অনুগত বলে অভিযোগ তুলে বিচার দাবি করেছে। তার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ-জাভাদ জারিফের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিয়ে নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফেরার সময় প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বিরুদ্ধেও কট্টরপন্থীরা স্লোগান দেয় এবং তাকে অনুপ্রবেশকারী বলে আখ্যা দেয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বৈঠককে কেন্দ্র করে তার অভিশংসনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

পেজেশকিয়ানকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে অনলাইন প্রচারও শুরু করেছে কট্টরপন্থীরা। ফলে রায়িসির কারাদণ্ডকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ এখন গালিবাফ ও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরের বৃহত্তর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল