ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন নেটওয়ার্কের ওপর নজরদারি জোরদার করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ধর্মীয় অনুদান সংগ্রহের আড়ালে ইরান সরকার অর্থ স্থানান্তরের কিছু নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করতে পারে। বিশেষ করে শিয়া মুসলমানদের দেওয়া ধর্মীয় কর ‘খুমস’-এর অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অপরাধবিষয়ক তদন্ত সংস্থা ফিনসেন এ বিষয়ে একটি সতর্কবার্তা জারি করে। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইরান সরকারের সম্ভাব্য অপব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেন শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইরানের প্রভাবশালী কিছু ধর্মীয় নেতার পক্ষে খুমস সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে পারে। সংগৃহীত অর্থ ইরানে কিংবা ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছে পাঠাতে অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তরব্যবস্থা, যেমন হাওয়ালা নেটওয়ার্ক ও নগদ অর্থ বহনকারীদের ব্যবহার করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অপব্যবহার করে নিজেদের অভিজাত মহলের সম্পদ বাড়ানো এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন চালিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।
ফিনসেন কয়েকটি সন্দেহজনক লেনদেনের লক্ষণও চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, দৃশ্যমান কোনো দাতব্য কার্যক্রম ছাড়াই অনুদান সংগ্রহ করা; অল্প সময়ের মধ্যে অজ্ঞাত উৎস থেকে বড় অঙ্কের অনুদান গ্রহণের পর অন্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য অর্থ পাঠানো; আর্থিক প্রতিবেদন ও নথি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা এড়ানোর চেষ্টা; এবং কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই, এমন প্রাপক প্রতিষ্ঠানের অর্থ নগদে তুলে নেওয়া বা অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া।
তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এসব লক্ষণের কোনো একটিই এককভাবে অবৈধ বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সতর্কবার্তায় দেশটির বা ইউরোপের নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় কেন্দ্রকে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত বলেও চিহ্নিত করা হয়নি। তবে ইরানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বা আর্থিক সম্পর্কের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অতীতে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে খুমসের অর্থ স্থানান্তর নিয়ে মামলা
ফিনসেনের সতর্কবার্তায় যুক্তরাষ্ট্রে খুমসের অর্থ সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি ছাড়াই ইরানে পাঠানোর একটি ফৌজদারি মামলার উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালে মুজ্জামিল জায়েদি ও আসিম মুজতবা নাকভি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে নিজেদের দোষ স্বীকার করেন। মামলায় বলা হয়, তাঁরা কয়েক দশ হাজার ডলার সংগ্রহ করে ইরানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নামে নেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে কয়েকজন ধর্মীয় নেতার পক্ষে খুমস সংগ্রহের অনুমতি পেয়েছিলেন জায়েদি। পরে তিনি ও নাকভি ধর্মীয় অনুদানের পাশাপাশি ইয়েমেনের যুদ্ধের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা কিছু অর্থও সংগ্রহ করেন।
মামলার কৌঁসুলিদের অভিযোগ, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও সহযোগীদের দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নগদ অর্থ বাইরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁরা। এর মাধ্যমে অর্থ ইরান এবং খামেনির কার্যালয়ে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ঘটনায় ইরাকের ধর্মীয় তীর্থযাত্রায় অংশ নেওয়া ২৫ জন যাত্রী ডলার বহন করেছিলেন, যা পরে ইরানে নেওয়া হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, নজরদারি এড়াতে অর্থের পরিমাণ এমনভাবে ভাগ করা হয়েছিল, যাতে প্রতিটি চালান ১০ হাজার ডলারের নিচে থাকে।
খুমসের অর্থ স্থানান্তর কীভাবে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে ফিনসেন নতুন সতর্কবার্তায় এই মামলাটি উল্লেখ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আলাভি ফাউন্ডেশন নিয়ে দীর্ঘ আইনি বিরোধ
ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে চলা আরেকটি আইনি বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে আলাভি ফাউন্ডেশন এবং নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত ৬৫০ ফিফথ অ্যাভিনিউ ভবন।
মার্কিন কৌঁসুলিদের অভিযোগ ছিল, ওই ভবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পত্তিটির ওপর ইরানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক মেল্লির মালিকানাসংশ্লিষ্ট স্বার্থ গোপন করেছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর বিষয়টি একটি বৃহত্তর সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ২০২৬ সালের মার্চে জানায়, ইরান-সমর্থিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের জন্য ওই সমঝোতার আওতায় প্রায় ৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলার দেওয়া হবে।
তবে সমঝোতার আওতায় আলাভি ফাউন্ডেশন কোনো দায় বা অন্যায় স্বীকার করেনি। প্রতিষ্ঠানটি ইরান সরকারের প্রতিনিধি বা অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে। ফাউন্ডেশনটির বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধে এবং তাদের সম্পত্তি নিয়ে করা সব দাবি চূড়ান্তভাবে খারিজ করা হয়েছে। পরে ৬৫০ ফিফথ অ্যাভিনিউয়ে নিজেদের স্বার্থসহ সম্পদ একটি নতুন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংস্থা অনুমোদিত জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার পর ফাউন্ডেশনটি বন্ধ হয়ে যাবে বলেও জানানো হয়।
যুক্তরাজ্যে ধর্মীয় কেন্দ্রের পরিচালনা নিয়ে তদন্ত
যুক্তরাজ্যের উত্তর লন্ডনে অবস্থিত শিয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামিক সেন্টার অব ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেও আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তদন্ত ও ব্যবস্থা নিয়েছে।
২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের দাতব্য প্রতিষ্ঠানবিষয়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা চ্যারিটি কমিশন কেন্দ্রটির পরিচালনা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কথা জানিয়ে বিধিবদ্ধ তদন্ত শুরু করে। এর আগে ২০২০ সালে কেন্দ্রটিতে আয়োজিত দুটি অনুষ্ঠানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির প্রশংসা ও স্মরণে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। সোলাইমানি তখন যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ট্রাস্টিরা তাঁদের আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সুরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেননি বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা মনে করলে একজন অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপক নিয়োগ করা হয়।
২০২৫ সালের মে মাসে চ্যারিটি কমিশন জানায়, তদন্ত চলাকালে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় অসদাচরণ বা অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং পরিচালনব্যবস্থায় সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তের সময় কেন্দ্রটির পরিচালনাসংক্রান্ত নথি থেকে এমন একটি শর্তও বাদ দেওয়া হয়, যাতে একজন ট্রাস্টিকে যুক্তরাজ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হতো। ওই ব্যক্তি পরে দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বার্থের সংঘাত এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তবে ট্রাস্টিরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু অনুসন্ধান ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। নির্ধারিত কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের পর অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সংস্কারের দায়িত্ব ট্রাস্টিদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সে সময় কমিশন জানিয়েছিল, বিধিবদ্ধ তদন্ত তখনো চলছিল।
জার্মানিতে খামেনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র নিষিদ্ধ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে জার্মানি ইসলামিক সেন্টার হামবুর্গ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংগঠন নিষিদ্ধ করে। জার্মান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, প্রতিষ্ঠানটি ইসলামপন্থী চরমপন্থী লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছিল।
জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, কেন্দ্রটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সরাসরি প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করত এবং জার্মানিতে ইসলামি বিপ্লব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল। নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে দেশটির আটটি রাজ্যের ৫৩টি স্থানে তল্লাশি চালানো হয় এবং চারটি শিয়া মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেজার স্পষ্ট করেছিলেন, এ পদক্ষেপের আওতায় শান্তিপূর্ণভাবে শিয়া ইসলাম পালনের অধিকার নিষিদ্ধ করা হয়নি।
পরে জার্মান কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রটির প্রধান মোহাম্মদ হাদি মোফাত্তেহকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। হামবুর্গের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে জার্মানিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির আনুষ্ঠানিক উপপ্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। জার্মানির এ পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে তেহরান দেশটিতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল।
নজরদারির কেন্দ্রে অর্থ স্থানান্তরের পথ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সতর্কবার্তায় বলা হয়নি যে সব শিয়া দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় কেন্দ্র ইরানের অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বরং ফিনসেন বলেছে, বৈধ দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। এ খাতকে স্বভাবগতভাবে সন্দেহজনক বিবেচনা না করে ঝুঁকির ভিত্তিতে লেনদেন যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি।
সতর্কবার্তার মূল লক্ষ্য হলো, ধর্মীয় অনুদান সংগ্রহ ও স্থানান্তরের প্রক্রিয়া নিষেধাজ্ঞা এড়ানো কিংবা অনানুষ্ঠানিক আর্থিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করা। যুক্তরাষ্ট্রের খুমস-সংক্রান্ত মামলায় দেশটিতে ধর্মীয় অনুদান সংগ্রহ করে নগদ অর্থ ইরানে পাঠানোর অভিযোগ আদালতে উঠেছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের ইসলামিক সেন্টার অব ইংল্যান্ড এবং জার্মানির ইসলামিক সেন্টার হামবুর্গের ঘটনাগুলোতে মূলত পরিচালনব্যবস্থা, স্বাধীনতা ও ইরানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
ঘটনাগুলোতে অভিযোগের ধরন ও আইনি প্রক্রিয়া এক নয়; তাই এগুলোকে ধর্মীয় অনুদানের অর্থ অপব্যবহারের একই ধরনের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সতর্কবার্তা থেকে স্পষ্ট, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন এবং অর্থ স্থানান্তরের অনানুষ্ঠানিক পথগুলোকে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল