অধিকৃত পশ্চিম তীরের আল-খলিল শহরে গুলিতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত ও আরও তিনজন আহত হওয়ার ঘটনায় হামলাটির প্রশংসা করেছে গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট। শুক্রবারের (২৩ অক্টোবর) এই ঘটনাকে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের চলমান নিপীড়ন ও সহিংসতার পাল্টা জবাব হিসেবে উল্লেখ করেছে জোটটি। এদিকে হামলার পর অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে পূর্ণ অবরোধের প্রস্তুতি নিতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনের জনপ্রতিরোধ কমিটি আল-খলিলের হামলাকে স্বাগত জানায়। গোষ্ঠীটি অভিযোগ করে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডজুড়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ, সেনাবাহিনী ও উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়াতেই এ হামলা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, ফিলিস্তিনিদের ওপর অব্যাহত নিপীড়ন দখলদারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না, একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের মনোবলও ভাঙতে পারবে না।
জনপ্রতিরোধ কমিটির দাবি, আল-খলিলের এই হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা, সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার ওপর বড় আঘাত হেনেছে। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাসও হামলাটিকে বীরত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে। তবে হামলার দায় স্বীকার করেনি তারা। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ঘটনাটিকে বীরত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বলেছে, হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা ও পবিত্র স্থাপনায় হামলাসহ ইসরায়েলের চলমান কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এ ধরনের হামলা স্বাভাবিক ও বৈধ প্রতিক্রিয়া।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম নিহত দুই সেনার পরিচয় প্রকাশ করেছে। তারা হলেন ২৩ বছর বয়সী স্টাফ সার্জেন্ট রন ইয়োনাতান রয়টম্যান, যিনি আশকেলনের বাসিন্দা, এবং ২০ বছর বয়সী সার্জেন্ট ইউভাল শাই স্বিলেম, যিনি হোদ হাশারনের বাসিন্দা। রয়টম্যান একটি সেনাদলের কমান্ডার ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হামলায় নিহত দুই ফিলিস্তিনি আরও বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল ৩৫ নম্বর সড়কে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর হামলা চালানো। তবে ওই সড়কে পৌঁছাতে পারবেন না বুঝতে পেরে তারা একটি অস্থায়ী সামরিক চৌকিতে গুলি চালান বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
নিহত দুই ফিলিস্তিনির নাম মোহাম্মদ জাবা ও ফিরাস জাবা। তাঁদের দুজনেরই বয়স ২৭ বছর এবং তারা আল-খলিলের বাসিন্দা। তারা একই পরিবারের সদস্য হলেও শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে সাতটার দিকে একটি গাড়িতে করে তারা আল-খলিল শহরের প্রবেশপথে সেনাদের স্থাপিত অস্থায়ী চৌকির কাছে পৌঁছান। এরপর পাশের একটি সড়কে গাড়ি থেকে নেমে অ্যাসল্ট রাইফেল ও পিস্তল নিয়ে চৌকিতে গুলি চালান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় আশপাশের ভবনকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেন তারা।
ঘটনার ভিডিওচিত্রে ফিলিস্তিনি দুই বন্দুকধারী ও ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে গোলাগুলির দৃশ্য দেখা গেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, এই বন্দুকযুদ্ধ ২০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে চলে।
হামলার পর নেতানিয়াহু ইসরায়েলের নিরাপত্তাপ্রধানদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা বৈঠক করেন। বৈঠকে সেনাপ্রধান আইয়াল জামির, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ, অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনি, শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা শমুয়েল বেন এজরা এবং সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান আভি ব্লুথ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে পূর্ণ অবরোধ কার্যকরের প্রস্তুতি নিতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন নেতানিয়াহু।
এদিকে হামলার পর ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেরি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দিয়ে নিরস্ত্র করার পাশাপাশি এর অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করতে হবে। তবে এই হামলায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল, এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচও পশ্চিম তীরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দেওয়া, অস্ত্র জব্দ করা এবং যোদ্ধাদের নির্মূল করতে বড় পরিসরে সামরিক অভিযান এড়ানোর সুযোগ নেই।
এদিকে জাতিসংঘের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ৯০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনা বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ৭৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন অথবা আহত হওয়ার পর মারা গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র: প্রেস টিভি