তেহরানের বৈঠক ঘিরে ইরানের কট্টরপন্থীদের মধ্যে মতভেদ

ইরানের সঙ্গে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের তেহরান বৈঠক আঞ্চলিক রাজনীতিতে দেশটির প্রভাবের স্বীকৃতি কি না, নাকি ইয়েমেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানকে ছাড় দিতে চাপ দেওয়ার উদ্যোগ, এ নিয়ে ইরানের কট্টরপন্থী মহলে মতভেদ দেখা দিয়েছে। কেউ বৈঠককে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, শান্তির বিনিময়ে দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করার চেষ্টা হতে পারে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) চার দেশের বৈঠক শেষে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা জানানো হয়। তবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালি কিংবা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তির ঘোষণা আসেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এক পাকিস্তানি কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরানে সংঘাত বন্ধের একটি প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্মতি ছিল। ওই কর্মকর্তা জানান, ইরান প্রস্তাবটি গ্রহণ করলে পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতার এর নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে কাজ করতে পারে।

এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য নিয়ে ইরানের ভাষ্যকারদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো কি তেহরানকে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাতে এসেছে, নাকি তাদের লক্ষ্য ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করা, এ নিয়ে বিতর্ক চলছে।

আঞ্চলিক প্রভাবের স্বীকৃতি, নাকি চাপ?

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র ইরান বৈঠক নিয়ে মঙ্গলবারের প্রতিবেদনের শিরোনাম দেয়, ইরানকে ছাড়া কখনোই নয়। সংবাদপত্রটির যুক্তি, অঞ্চলের তিন গুরুত্বপূর্ণ দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, তেহরানকে বাদ দিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাভান পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ও কট্টরপন্থী ভাষ্যকার আবদুল্লাহ গাঞ্জি আরও এক ধাপ এগিয়ে ইরানকে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র ইরান। তার মতে, একটি নতুন ইসরায়েলবিরোধী জোট গড়ে উঠছে।

ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ অবশ্য আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন। তার প্রস্তাবে অনাক্রমণ, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জারিফের ভাষায়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাইরে থেকে আমদানি করা যায় না; এ অঞ্চলের মানুষকেই সম্মিলিতভাবে তা গড়ে তুলতে হবে।

তবে সব কট্টরপন্থী ভাষ্যকার বৈঠকটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। কট্টরপন্থী ভাষ্যকার মোস্তফা নাজাফি এক্সে লিখেছেন, বৈঠকের ফলাফল মূল্যায়ন করার সময় এখনো আসেনি। তবে তার মতে, অবিশ্বাসের জায়গায় আস্থা কিংবা প্রতিযোগিতার জায়গায় সহযোগিতা এসেছে, এমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যে বৈঠকগুলো সমস্যা সমাধানের চেয়ে সংকট নিয়ন্ত্রণ ও তার পরিণতি এড়ানোর প্রচেষ্টায় বেশি ভূমিকা রাখছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান হেশমাতোল্লাহ ফালাহাতপিশেহর মতে, তেহরানে আসা দেশগুলোর কাছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের চেয়ে ইয়েমেন পরিস্থিতি বেশি তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয়। অনলাইন সংবাদমাধ্যম খবর অনলাইনকে তিনি বলেন, ইয়েমেনের সমস্যা অমীমাংসিত থাকলে ইরান প্রসঙ্গ আলোচ্যসূচিতে আসবে না।

ইয়েমেন প্রশ্নেই অবিশ্বাসের বড় বাধা

সৌদি আরব ও আঞ্চলিক নৌপরিবহনে হুথিদের হামলা রিয়াদের জন্য ইয়েমেনকে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগে পরিণত করেছে। অন্যদিকে, হুথিদের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ককে ইরানের কট্টরপন্থীরা দেশটির আঞ্চলিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখেন। ফলে ইয়েমেন নিয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগ এবং হুথিদের প্রতি ইরানের সমর্থন, দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট আরও জটিল করে তুলেছে।

কট্টরপন্থী কায়হান পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হোসেইন শরিয়তমাদারি ‘তেহরান সম্মেলন: পানি, নাকি মরীচিকা?’ শিরোনামের এক মন্তব্যে বৈঠকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার আশঙ্কা, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে গেলে ইরানের ওপর হুথিদের থেকে দূরত্ব তৈরির চাপ আসতে পারে। তবে তেহরান হুথিদের পরিত্যাগ করবে না বলে তিনি জোর দিয়েছেন।

কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মাহমুদ নবভিয়ানও আলোচনায় সৌদি আরবের অংশগ্রহণকে হুথিদের মোকাবিলায় রিয়াদের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এক্সে তিনি লেখেন, ইয়েমেনের নিপীড়িত মানুষের বিরুদ্ধে অন্যায্য অবরোধ চলতে থাকলে আনসারুল্লাহর হামলাও অব্যাহত থাকবে; অন্য দেশগুলোর সহায়তাও সৌদি আরবের কোনো কাজে আসবে না।

কট্টরপন্থী সাংবাদিক ফেরেশতেহ সাদেঘিও এই সফরকে সন্দেহের চোখে দেখেছেন। তার ধারণা, ইয়েমেন প্রশ্নে তেহরানকে সতর্ক করতেই আঞ্চলিক কর্মকর্তারা এসেছেন। তিনি লেখেন, এমন সতর্কবার্তা মেনে নেওয়ার মতো বোকামি ইরানের করা উচিত হবে না। তেহরানের ওপর চাপ এলেও হুথিরা স্বাধীনভাবে নিজেদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এই মতভেদ আঞ্চলিক কূটনীতির একটি বড় বাধা তুলে ধরেছে। সৌদি আরব হুথিদের হামলা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে যে পদক্ষেপ চাইতে পারে, ইরানের কট্টরপন্থীরা সেটিকেই তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল করার ছাড় হিসেবে দেখতে পারেন।

আঞ্চলিক শক্তিগুলো কি চুক্তির নিশ্চয়তা দিতে পারবে?

ইয়েমেনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নতুন হামলা থেকে ইরানকে সুরক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা তৈরিতেও সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও কাতার ভূমিকা রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন করে সংঘাত শুরু না হওয়ার নিশ্চয়তা চেয়ে আসছে তেহরান। কূটনীতি পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্রের কূটনৈতিক সম্পাদক মরিয়ম সালারি মনে করেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর নিশ্চয়তা দেওয়ার সম্ভাবনা থেকেই বোঝা যায়, আলোচনার মূল প্রশ্ন কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান কী ছাড় দেবে, তা নয়। তিনি লেখেন, পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান এখন ছাড় দেবে কি না, সেটিই একমাত্র প্রশ্ন নয়; ছাড় দেওয়ার পর আবার যুদ্ধ শুরু হবে না, তার নিশ্চয়তা কী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তার ধারণা, এই উদ্বেগের জবাব খুঁজতেই সফরকারী কর্মকর্তারা তেহরানে এসেছেন।

সংস্কারপন্থী সাংবাদিক ফরিদ মোদাররেসিও কূটনীতির সম্ভাবনা দেখছেন। তার মতে, পাকিস্তান ও কাতারের নেতৃত্বে চলা মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় সৌদি আরব ও তুরস্ক যুক্ত হলে আঞ্চলিক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

তবে বৈঠক নিয়ে ইরানের কট্টরপন্থীদের পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সম্ভাব্য সমঝোতার পথ কতটা কঠিন হতে পারে। এক পক্ষের কাছে এই সফর তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাবের স্বীকৃতি; অন্য পক্ষের আশঙ্কা, শান্তি প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে ইরানকে সেই প্রভাবের কিছু অংশ ছেড়ে দিতে বলা হতে পারে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল