জীবনের গতি কোন ট্র্যাজেডির কাছে থেমে থাকতে পারে না: গাজায় স্বজনহারা চিকিৎসক

ইসরায়েলের যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, স্বজন হারানোর বেদনা ও কর্মক্ষেত্রের অবিরাম চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন গাজার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ না থাকায় অনেকেই একাকী মোকাবিলা করছেন ভয়াবহ মানসিক ট্রমা।

দেইর আল-বালাহ, গাজা: ২৯ বছর বয়সী মানার ফাইয়াদ আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের একজন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তিনি গুরুতর মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বরের একটি ঘটনা তাঁর জীবন বদলে দেয়। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুত এক গুরুতর আহত ব্যক্তিকে দেখে তিনি বুঝতে পারেন, ওই ব্যক্তি আর কেউ নন—তাঁর নিজের ভাই শাদি। ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছিলেন ৩৪ বছর বয়সী শাদি।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে মানার বলেন, জরুরি অস্ত্রোপচারের আগে এক গুরুতর আহত ব্যক্তিকে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার জন্য তাঁকে অপারেশন থিয়েটারে ডাকা হয়েছিল।

তিনি বলেন, “আমি তাঁর কাছে পৌঁছানোর আগেই তিনি মারা যান। অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে তাঁর পোশাক দেখে আমার অদ্ভুত অনুভূতি হয়। কাছে গিয়ে মুখের ওপর থেকে কাপড় সরাতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। দেখি, তিনি আমার ভাই শাদি।”

এরপর থেকে হাসপাতালটি তাঁর কাছে ভয়াবহ স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে তিনি আর কাজে ফিরতে পারেননি। অকালেই শেষ হয়ে যায় তাঁর পেশাগত জীবন।

এখনো সেই অভিজ্ঞতার মানসিক ও স্নায়বিক প্রভাব বয়ে বেড়াচ্ছেন মানার। পেশাদার কোনো সহায়তা ছাড়াই নিজের মতো করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। সামাজিক জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। মানুষের সঙ্গ ও কোলাহল এড়িয়ে চলেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে মানসিক শান্তির খোঁজে রয়েছেন তিনি।

সমুদ্রের পাশে বসে থাকা এবং লেখালেখি তাঁকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। এর মাধ্যমে নিজের কষ্ট প্রকাশ ও ঘটে যাওয়া ঘটনা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে গাজা ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তাঁর আশা, দূরে কোথাও চলে যেতে পারলে হয়তো সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি থেকে মুক্তি মিলবে।

ভাই, পেশা ও সামাজিক জীবনের বড় একটি অংশ হারানোর পর এখন মানারকে লড়তে হচ্ছে আরেকটি যুদ্ধের বিরুদ্ধে—যে মানসিক আঘাত তিনি একাই মোকাবিলার চেষ্টা করছেন।

স্বজন হারিয়েও আবার হাসপাতালে ফিরেছেন খালেদ

আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ২৯ বছর বয়সী নার্স খালেদ রাফাতও ভয়াবহ ব্যক্তিগত ক্ষতির শিকার হয়েছেন। ২০২৩ সালের ১৮ অক্টোবর তাঁর পরিবারের বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় স্ত্রী, সন্তান, মা এবং কয়েকজন ভাইবোন নিহত হন। ওই সময় তিনি হাসপাতালে ছিলেন এবং সেদিন আহত অন্য মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন।

খালেদ আল জাজিরাকে বলেন, “পরিবারের সবাইকে হারানোর খবর আমার জীবনের এক বেদনাদায়ক মোড় ছিল। এরপর আগের মতো কাজ করতে পারছিলাম না। যে হাসপাতাল একসময় আমার মানবিক দায়িত্ব পালনের জায়গা ছিল, সেটিই ব্যক্তিগত যন্ত্রণার স্মারক হয়ে ওঠে। এই ঘটনা আমার পেশাগত ও সামাজিক জীবন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।”

তবে একসময় তিনি নতুন করে জীবন গড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

খালেদ বলেন, “আমি বুঝতে পারি, জীবনের গতি এই ট্র্যাজেডির কাছে থেমে থাকতে পারে না। আমাকে সামনে এগোনোর পথ খুঁজতে হবে। মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা শুরু করি। নতুন করে বিয়ে করি এবং স্থিতিশীলতা ও আশার সন্ধানে নতুন পরিবার গড়ে তুলি। এরপর আবার হাসপাতালে কাজে ফিরে আসি।”

নিহত ১,৭০০ স্বাস্থ্যকর্মী, আটক ৮৩

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৭০০ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৮৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী এখনো ইসরায়েলের আটক অবস্থায় রয়েছেন।

তবে এই পরিসংখ্যানের বাইরে রয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের গভীর মানসিক সংকট। পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও সহকর্মীদের হারানোর পাশাপাশি প্রতিদিন ভয়াবহ আহত মানুষ ও মৃত্যুর দৃশ্য দেখতে হচ্ছে তাঁদের। বছরের পর বছর ধরে তাঁরা বাস্তুচ্যুতি, নিরবচ্ছিন্ন কাজের চাপ এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝাও বহন করছেন।

গাজার চিকিৎসাকর্মীদের ওপর চাপ নিয়ে পাবলিক লাইব্রেরি অব সায়েন্সে (পিএলওএস) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৪১ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী পরিবারের সদস্য হারানোর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। আর ৪৬ শতাংশ ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি কর্মস্থল থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও গেছেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গাজার অন্তত ৭৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ, ভয়াবহ মানসিক আঘাতের মুখে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত।

এর ফলে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা একদিকে যেমন কর্মীসংকটে পড়ছে, অন্যদিকে অবশিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পেশায় ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠছে।

কতসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী গাজা ছেড়ে চলে গেছেন কিংবা পেশা ছেড়েছেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে সরকারি প্রতিবেদনগুলোতে স্বাস্থ্য খাতে ‘মানবসম্পদের ক্ষয়’ এবং ‘চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা হ্রাসের’ বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা