বিদেশে বসবাসরত ইরানিদের দেশে ফেরার আহ্বান জানানোর আগে ইরানে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সুইডিশ-ইরানি গবেষক আহমাদরেজা জালালির স্ত্রী ভিদা মেহরান্নিয়া। তাঁর স্বামীর মতো যারা ইরান সফরে গিয়ে কারাবন্দি হয়েছেন, তাঁদের মুক্তি নিশ্চিত না করে প্রবাসীদের দেশে ফেরার আমন্ত্রণ অর্থহীন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার ইরান ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেহরান্নিয়া বলেন, ‘আপনারা যদি মানুষকে আমন্ত্রণ জানাতে চান, তাহলে প্রথমে দরজা খুলতে হবে। আগে সেই দরজা খুলুন। যারা ভেতরে বন্দি আছেন, তাঁদের মুক্তি দিন।’
জালালি দুর্যোগ চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তিনি সুইডেন, বেলজিয়াম ও ইতালির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন। ২০১৬ সালের এপ্রিলে একটি একাডেমিক কর্মশালায় অংশ নিতে ইরান সফরে গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০১৭ সালের অক্টোবরে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জালালি। তাঁর দাবি, নির্যাতনের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল।
মেহরান্নিয়ার অভিযোগ, কারাগারে জালালিকে একাধিকবার আসন্ন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁকে দীর্ঘ সময় একাকী বন্দিত্বে রাখা হয়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী অনশনেও বাধ্য হতে হয়েছে। এসব কারণে তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতি হয়েছে বলে জানান স্ত্রী।
দীর্ঘ কারাবাসের প্রভাব পড়েছে তাঁদের পরিবারেও। মেহরান্নিয়া বলেন, তাঁদের ১৪ বছর বয়সী ছেলে বাবার সঙ্গে একসময় একসঙ্গে থাকার স্মৃতি প্রায় ভুলে গেছে। আর জালালি কারাগারে থাকতেই তাঁদের মেয়ে পড়াশোনা শেষ করেছে।
তিনি আরও জানান, বন্দিবিনিময়ের দুটি উদ্যোগেও জালালিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর মধ্যে ২০২৪ সালের সেই বন্দিবিনিময় চুক্তিও ছিল, যার আওতায় সুইডেনের দুই নাগরিক মুক্তি পান এবং বিনিময়ে সাবেক ইরানি কারা কর্মকর্তা হামিদ নুরি মুক্তি পান।
জালালির ঘটনা ইরান সফরে গিয়ে আটক হওয়া শিক্ষাবিদ, দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ও বিদেশি বাসিন্দাদের কয়েকটি ঘটনার মধ্যে একটি। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধেই গুপ্তচরবৃত্তি বা জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০১৬ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক শিউয়ে ওয়াং গবেষণার জন্য ঐতিহাসিক নথি সংগ্রহ করতে ইরান গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া এই মার্কিন গবেষক ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তি পান।
ব্রিটিশ-অস্ট্রেলীয় শিক্ষাবিদ কাইলি মুর-গিলবার্ট ২০১৮ সালে ইরানে একটি সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়ে আটক হন। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দুই বছরের বেশি সময় কারাভোগের পর ২০২০ সালের নভেম্বরে বিদেশে আটক তিন ইরানির বিনিময়ে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ-ইরানি দাতব্য সংস্থার কর্মী নাজানিন জাগারি-র্যাটক্লিফ ২০১৬ সালে মেয়েকে নিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে ইরান গেলে আটক হন। প্রায় ছয় বছর কারাভোগের পর ২০২২ সালের মার্চে তিনি মুক্তি পান।
জালালির মামলার পুনর্বিচার বা বিচারিক পর্যালোচনার জন্য বারবার আবেদন করেও ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সাড়া পাননি বলে অভিযোগ করেছেন মেহরান্নিয়া। তাঁর ভাষ্য, কর্তৃপক্ষ জালালিকে জানিয়েছে, মামলাটি আন্তর্জাতিক বিষয়।
মেহরান্নিয়ার দাবি, জালালিকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা ইরানি কর্তৃপক্ষের রয়েছে। দীর্ঘ কারাবাসে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হলেও কর্তৃপক্ষ বারবার ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল