ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ নতুন নয়। তবে দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী গাদি আইজেনকোটের প্রস্তাবিত ‘কিল জোন’ পরিকল্পনা সেই উদ্বেগ মোকাবিলায় একটি ভিন্ন কৌশলের ইঙ্গিত বহন করে। এর লক্ষ্য শুধু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় এক দফা হামলা চালানো নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক উপাদান ও স্থাপনাগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা এবং কোনো সন্দেহজনক তৎপরতা দেখা দিলে দ্রুত সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখা।
২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত জেরুজালেম পোস্ট-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে আইজেনকোটের এই প্রস্তাবের কথা উঠে আসে। পরিকল্পনাটির কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের যেসব স্থানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নজরদারি ও সামরিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা।
প্রস্তাবটির তাৎপর্য হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতা হলেও সেটিকে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখতে চান আইজেনকোট। অর্থাৎ, কূটনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি সামরিক চাপও অব্যাহত রাখার একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে।
‘কিল জোন’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
সামরিক পরিভাষায় ‘কিল জোন’ বলতে সাধারণত এমন একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা পরিসর বোঝায়, যেখানে শত্রুপক্ষের কোনো লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত হলে সেটিকে আঘাত করার সামরিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতি রাখা হয়।
আইজেনকোটের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও নির্দিষ্ট। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক উপাদান, বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। ইরান যদি এসব উপাদান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সেটিকে সম্ভাব্য পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবনের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, পরিকল্পনাটি কেবল কোনো স্থাপনা ধ্বংস করার বিষয় নয়; বরং পারমাণবিক উপাদানের অবস্থান ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে রাখার সামরিক ব্যবস্থা।
৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা পারমাণবিক কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহারের জন্য অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশের কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি নির্দেশ করে।
তবে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকা মানেই কোনো দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে—এমন নয়। অস্ত্র তৈরির জন্য আরও প্রযুক্তিগত ও প্রকৌশলগত ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
আইজেনকোটের পরিকল্পনায় এই ইউরেনিয়ামের মজুতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ পারমাণবিক উপাদান যদি গোপনে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা নজরদারি কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রকে কেন সামনে রাখতে চান আইজেনকোট?
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। আইজেনকোট চান, ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে এমন প্রতিশ্রুতি দিক যে ইরান পারমাণবিক উপাদান সরানোর চেষ্টা করলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক প্রযুক্তি, আকাশপথে নজরদারি এবং সামরিক শক্তি এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরোধবার্তা তৈরি করতে পারে।
এখানে আইজেনকোটের কৌশলগত হিসাব হলো, ইসরায়েল এককভাবে দীর্ঘদিন ধরে এমন নজরদারি ও সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে এই ব্যবস্থার প্রধান অংশীদার করবে।
পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের বিকল্প, নাকি যুদ্ধের নতুন প্রস্তুতি?
পরিকল্পনাটিকে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিরোধের একটি প্রস্তাব। এর মাধ্যমে ইরানকে এমন পরিস্থিতিতে রাখা হবে, যেখানে পারমাণবিক উপাদান সরানো বা কর্মসূচি পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করলেই সামরিক হামলার আশঙ্কা থাকবে।
তবে এই ব্যবস্থাকে যুদ্ধের ঝুঁকিমুক্তও বলা যায় না। কারণ কোনো দেশের পারমাণবিক স্থাপনা বা উপাদান সরানোর চেষ্টা কীভাবে শনাক্ত ও ব্যাখ্যা করা হবে, তা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। একটি সন্দেহজনক তৎপরতাকে সামরিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে হামলা চালানো হলে বড় সংঘাতের সূত্রপাতও হতে পারে।
এ ছাড়া ইরান যদি এ ধরনের নজরদারিকে তার সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে, তাহলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকবে। ফলে পরিকল্পনাটি পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর চাপ তৈরি করলেও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর নিশ্চয়তা দেয় না।