নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে ঘিরে প্রচারের পরিকল্পনা করলেও এখন তার বদলে গভর্নর ক্যাথি হোকুলকেই প্রধান নিশানা বানিয়েছে রিপাবলিকানরা। দ্বিতীয় মেয়াদে গভর্নর পদে লড়াই করা হোকুলকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে কর, অপরাধনীতি ও অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা জোরদার করছে রিপাবলিকান প্রার্থীরা। একই সময়ে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীও হোকুলের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখছেন।
নিউইয়র্কে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এমন বেশ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন রয়েছে। ফলে গভর্নর পদে হোকুল ও রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রুস ব্লেকম্যানের লড়াইয়ের প্রভাব অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন কংগ্রেসীয় আসনের ভোটেও পড়তে পারে। রিপাবলিকানদের লক্ষ্য, হোকুলের তুলনামূলক দুর্বল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ভোট টানা।
নিউইয়র্কের একজন ডেমোক্র্যাট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, দোদুল্যমান আসনের কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থীই হোকুলের খুব কাছাকাছি যেতে চাইছেন না। তার ভাষায়, চার বছর আগের তুলনায় হোকুলের অবস্থান কিছুটা ভালো হলেও তার জনপ্রিয়তার পরিসংখ্যান এখনো শক্তিশালী নয়।
মামদানিকে রিপাবলিকানদের জন্য সম্ভাব্য বড় প্রচার-অস্ত্র হিসেবে দেখা হয়েছিল। ৩৪ বছর বয়সী এই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী মেয়র বাড়িভাড়া স্থগিত রাখা ও ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর মতো নীতির পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। কিন্তু নিউইয়র্ক শহরের বাইরে তার প্রভাব তুলনামূলক সীমিত হওয়ায় রিপাবলিকানরা এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে হোকুলকে। বিশেষ করে শহরতলি ও অঙ্গরাজ্যের উত্তরাঞ্চলে ভোটারদের কাছে মেয়রের চেয়ে গভর্নরই বেশি পরিচিত ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন বলে রিপাবলিকান প্রার্থীদের কয়েকজনের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা মার্ক মোলিনারো বলেন, নিউইয়র্ক শহরের গণমাধ্যমের আওতার বাইরে মামদানির তেমন প্রভাব নেই। তার ভাষায়, অঙ্গরাজ্যের আরও উত্তরের অনেক মানুষের শহরের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক নেই; তারা সেখানে কাকে দেখছেন, সেই প্রশ্নে হোকুলই সামনে চলে আসছেন।
লং আইল্যান্ডে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক লিপেট্রি তার সাধারণ নির্বাচনী প্রচারের প্রথম টেলিভিশন বিজ্ঞাপনেই হোকুল ও টম সুয়োজির সমালোচনা করেছেন। রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য নিক লালোটার বিজ্ঞাপনেও হোকুলের করনীতিকে আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু করা হয়েছে। আবার এলিস স্টেফানিকের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা রিপাবলিকান প্রার্থী অ্যান্থনি কনস্টান্টিনো তার ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লেক জেন্ডেবিয়েনকে হোকুলের কাছে নতিস্বীকার করার অভিযোগ তুলেছেন।
হোকুলের মুখপাত্র রায়ান রাদুলোভাকি অবশ্য রিপাবলিকানদের এই প্রচারের পাল্টা সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, রিপাবলিকানরা মেডিকেইড ও খাদ্য সহায়তায় কাটছাঁট করেছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করেছে। বিপরীতে হোকুল নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের জন্য অর্থ ফেরত, বিনা মূল্যে স্কুলের খাবার এবং ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
রিপাবলিকানদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয়, উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের কারণে। এসব ইস্যুর সঙ্গে হোকুলকে যুক্ত করে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে চাইছে দলটি। তবে ডেমোক্র্যাটদের কয়েকজন কৌশলবিদ মনে করছেন, হোকুলকে আক্রমণ করা ট্রাম্পের সঙ্গে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সম্পর্কের চেয়ে বেশি কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জন্যও হোকুলকে ঘিরে অবস্থান নেওয়া সহজ হচ্ছে না। একদিকে গভর্নর হিসেবে তিনি অঙ্গরাজ্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাংগঠনিক ও আর্থিক শক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন কংগ্রেসীয় আসনে দলীয় প্রার্থীদের সহায়তা করছেন। অন্যদিকে, যেসব আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের স্বাধীন বা মধ্যপন্থী ভোটারদের সমর্থন প্রয়োজন, সেখানে হোকুলের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা রিপাবলিকানদের আক্রমণের সুযোগ করে দিতে পারে।
নর্থ কান্ট্রিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ব্লেক জেন্ডেবিয়েন সম্প্রতি সমর্থকদের বলেছেন, তার নির্বাচনী এলাকায় হোকুল অজনপ্রিয় এবং ভোটারদের মধ্যে তার সমর্থনের চেয়ে বিরোধিতাই বেশি। স্টেটেন আইল্যান্ড ও ব্রুকলিনের অংশ নিয়ে গঠিত একটি রিপাবলিকান-ঝোঁকযুক্ত আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মাইক ডেসিলিসকেও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, প্রচারে হোকুল তার জন্য সহায়ক হবেন কি না। তার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, সম্ভবত না।
তবে হোকুল নিজে ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসীয় আসন পুনরুদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিউইয়র্ক এমন একটি অঙ্গরাজ্য হবে, যেখান থেকে হাকিম জেফরিস প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন পাবেন। দলীয় সংগঠনের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন আসনে মাঠপর্যায়ের কার্যালয় ও নির্বাচনী অবকাঠামো গড়ে তুলছেন এবং নিচের স্তরের প্রার্থীদের সহায়তা করছেন।
সিয়েনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের আগস্টের জরিপে সম্ভাব্য নিউইয়র্কের ভোটারদের মধ্যে হোকুল ৪৯ শতাংশ এবং ব্লেকম্যান ৩৯ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন। তবে একই সময়ে হোকুলের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। পলিটিকোর উদ্ধৃত আগস্টের জরিপে ৪৯ শতাংশ ভোটার তার প্রতি নেতিবাচক এবং ৪৬ শতাংশ ইতিবাচক মত জানিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামদানির ক্ষেত্রে চিত্রটি অঞ্চলভেদে আলাদা। নিউইয়র্ক শহরে তার জনপ্রিয়তা তুলনামূলক বেশি হলেও শহরতলি ও অঙ্গরাজ্যের উত্তরাঞ্চলে তার গ্রহণযোগ্যতা কম। এর ফলে রিপাবলিকানদের জন্য মামদানিকে ঘিরে প্রচার শহরের বাইরের অনেক আসনে প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি না করায় হোকুলই এখন তাদের প্রচারের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন।
তবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য হোকুলকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। দলীয় চেয়ারম্যান জে জ্যাকবসের ভাষায়, কোনো দলই নির্বাচনী টিকিটের শীর্ষ প্রার্থীর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে প্রচার চালানোর কৌশলকে সহজভাবে নিতে পারে না। হোকুল নভেম্বরে জয়ী হলে অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিতে তার প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, ফলে দলীয় প্রার্থীদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কতটা দূরে থেকে আবার কতটা কাছে থেকে তার সঙ্গে প্রচার চালানো হবে। সূত্র: রিপাবলিকো