ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে প্রবেশ করা রাশিয়ায় শুরু হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্ট নির্বাচন। ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী ভোটে দেশটির ৪৫০ সদস্যের স্টেট ডুমার সব আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা না থাকলেও, ভোটটি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন ক্রেমলিনের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
রাশিয়ার ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়া আবারও ডুমায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে—এমন প্রত্যাশাই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এই নির্বাচন শুধু সংসদের আসন বণ্টনের বিষয় নয়; যুদ্ধ, অর্থনীতি, জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর ওপরই এর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যে প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এটি রাশিয়ার প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট পুতিন নিজেই নির্বাচনের আগে ভোটকে যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থন ও জাতীয় ঐক্যের একটি সূচক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, নির্বাচন রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের সুযোগ।
ফলে নির্বাচনের ফলাফল ক্রেমলিনের কাছে শুধু সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব নয়; যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ভিত্তি পরিমাপের ক্ষেত্র হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিরোধীদের জায়গা কতটা?
রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশে বিরোধীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট আগস্টে ইয়াবলোকো দলকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দলটিকে রাশিয়ার একমাত্র নিবন্ধিত দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা প্রকাশ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করে।
ইয়াবলোকোর কিছু প্রার্থী নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় থাকার চেষ্টা করলেও দলটির অধিকাংশ প্রার্থী বাধার মুখে পড়েছেন। মস্কোর ২৪ বছর বয়সী ইয়াবলোকো প্রার্থী পোলিনা লেরমান্ট যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে তাঁর মতো প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক ও আইনি ঝুঁকি রয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
এদিকে রাশিয়ায় যুদ্ধের সমালোচনার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক বার্তা সরাসরি নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় তুলে ধরার সুযোগ সীমিত।
যুদ্ধফেরত সেনারাও প্রার্থী
এবারের নির্বাচনে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রায় ২০০ রুশ সেনা ও যুদ্ধভেটেরান প্রার্থী হয়েছেন। ক্রেমলিন তাদের জাতীয় বীর হিসেবে তুলে ধরছে এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের যোগ্যতা হিসেবে প্রচারে ব্যবহার করছে।
এর মাধ্যমে যুদ্ধের সঙ্গে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সম্পর্ক আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। সেনাবাহিনী ও যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করাও ক্রেমলিনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাপও নির্বাচনের পটভূমিতে
নির্বাচনের সময় রাশিয়া অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও রয়েছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় দেশটির কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সিজরান ও সারাতভ তেল শোধনাগারের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এর ফলে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মস্কো পেট্রোল ও ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধও আরোপ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্বাচনের আগে সুদের হার ১৪ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও সরকারের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
ভোটের ফলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ভোটের বার্তা
ইউনাইটেড রাশিয়ার সংসদীয় আধিপত্য বজায় থাকার প্রত্যাশা থাকলেও ক্রেমলিন ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং ভোটের সামগ্রিক চিত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ ও জনমনে উদ্বেগ নির্বাচনে ভোটার আচরণে প্রতিফলিত হতে পারে।
অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা এক বিষয়; কিন্তু ভোটারদের উপস্থিতি, বিভিন্ন দলের ভোটের ব্যবধান এবং যুদ্ধ ও অর্থনীতি নিয়ে জনগণের মনোভাব আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পুতিনের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
স্টেট ডুমায় সরকারপন্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকলে ক্রেমলিনের আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। বর্তমান ডুমা ইতোমধ্যেই সরকারের বিভিন্ন নীতি ও যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সমর্থন দিয়েছে।
এ কারণে এবারের নির্বাচনকে পুতিনের জন্য নতুন কোনো ক্ষমতা অর্জনের নির্বাচন হিসেবে না দেখে বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি জনসমর্থন প্রদর্শনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। তবে ভোটের মাধ্যমে যুদ্ধ ও সরকারের নীতির প্রতি জনগণের সমর্থনের মাত্রা কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
সামনে কী?
১৮–২০ সেপ্টেম্বরের ভোটের পর রাশিয়ার নতুন স্টেট ডুমা গঠিত হবে। ইউক্রেন যুদ্ধ অব্যাহত থাকা, অর্থনৈতিক চাপ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নতুন সংসদের প্রধান ভূমিকা হবে সরকারের আইনগত ও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে এগিয়ে নেওয়া।
তবে নির্বাচনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হতে পারে অন্য জায়গায়—যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল এবং জনগণের মধ্যে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে কী ধরনের মনোভাব তৈরি হয়েছে, তার একটি রাজনৈতিক সংকেত পাওয়া।
এ কারণে এবারের রুশ পার্লামেন্ট নির্বাচন শুধু ৪৫০টি আসনের প্রতিযোগিতা নয়; এটি পুতিনের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার জন্য যুদ্ধকালীন জনসমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সরকারি তথ্য ব্যবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক
স্ন্যাপের ২২০০ ডলারের স্মার্ট চশমায় নতুন চমক
৯০৭ কেজি ওজনের বোমা কতটা শক্তিশালী?
ইরান যুদ্ধ নিয়ে উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প