যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হতে যাচ্ছেন হাকিম জেফরিস

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ফলে দেশটির প্রতিনিধি পরিষদের পরবর্তী স্পিকার হওয়ার পথে এগিয়ে রয়েছেন হাকিম জেফরিস। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হবেন। তবে স্পিকার হিসেবে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরোধিতা করার পাশাপাশি নিজ দলের মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল অংশের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা।

নিউইয়র্কের একটি কংগ্রেশনাল জেলার প্রতিনিধি জেফরিসের নেতৃত্বে নতুন প্রতিনিধি পরিষদ আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দায়িত্ব নেবে। গত চার বছর রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পরিষদের নেতৃত্ব তখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার কথা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে নির্বাচনে জয়ের পর দেওয়া বক্তব্যে জেফরিস বলেন, ‘আজ যুক্তরাষ্ট্রের মহান প্রত্যাবর্তনের সূচনা হলো।’ প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পর তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিজয়ী ভাষণে গত দুই বছরে কংগ্রেসে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকানদের নীতির সমালোচনা করেন জেফরিস। তিনি দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে বড় ধরনের ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২৫ সালের ৪ জুলাই আইনে পরিণত হওয়া ওই ব্যয় সংকোচনমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

জেফরিস বলেন, মার্কিন জনগণ তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তারা চরমপন্থা ও দুর্নীতিতে বিরক্ত এবং এমন একটি কংগ্রেস চায়, যারা জনগণের জন্য কাজ করবে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আনতে চান জেফরিস। বিশেষ করে ট্রাম্পের বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচার ও প্রকল্পে বড় অঙ্কের অনুদান দেওয়া করপোরেট নির্বাহীদের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন তিনি। যদিও ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।

ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া প্রতিনিধি পরিষদের নজরদারি কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনের রাতে এক বিবৃতিতে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বার্তা দেন, ‘আইনজীবী নিয়োগ করুন।’ তবে জেফরিসের নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটরা ঠিক কত আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছেন, ভোট গণনা চলতে থাকায় তা তখনো নিশ্চিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার আইন প্রণয়নের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। কোন বিল ভোটাভুটির জন্য তোলা হবে, আর কোনটি আটকে থাকবে, সে বিষয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পর প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাংবিধানিক উত্তরাধিকারক্রমেও স্পিকারের অবস্থান দ্বিতীয়।

চলতি মাসের শেষ দিকে নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সদস্যরা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জানুয়ারির স্পিকার নির্বাচনে দলের প্রার্থী মনোনীত করবেন। ডেমোক্র্যাট নেতাদের একাধিক সহযোগীর বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, জেফরিসের অবস্থানকে গুরুতরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, এমন কাউকে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা ভোট দিয়ে ১৭৮৯ সাল থেকে ৫৭তম স্পিকার নির্বাচন করবেন। রিপাবলিকানরাও নিজেদের প্রার্থী দেবে, তবে তার জয়ের সম্ভাবনা খুবই কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে নিজ দলের সব সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত করা জেফরিসের জন্য সহজ হবে না। বিশেষ করে প্রগতিশীল অংশের কয়েকজন সদস্য তার কাছে বিভিন্ন নীতিগত অবস্থানের নিশ্চয়তা চাইছেন। নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত প্রতিনিধি দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভ্যানিটি ফেয়ারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেফরিসকে স্পিকার হিসেবে সমর্থন করবেন কি না, তা নিশ্চিত করেননি।

তিনি ভোটাধিকার সংস্কার, সরকারি আবাসন খাতে বিনিয়োগ, ইসরায়েলের কাছে আক্রমণাত্মক অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মতো কয়েকটি দাবির কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু জেফরিসের নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো বড় অঙ্কের অনুদান দিয়েছে। এ ছাড়া ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ কর্মসূচির প্রতিও তিনি খুব একটা সমর্থন দেখাননি। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যপন্থী অংশের অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় অত্যন্ত বেশি হতে পারে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কিন সরকারব্যবস্থা বিষয়ক অধ্যাপক মিশেল সোয়ার্সের মতে, প্রগতিশীলদের সমর্থন পেতে জেফরিসকে কী ধরনের ছাড় দিতে হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে তাঁদের দাবির প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকলে দলের মধ্যপন্থী সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোই অগ্রাধিকার

৫৬ বছর বয়সী জেফরিস নিজ দলের মধ্যে সমঝোতা তৈরির দক্ষতার জন্য পরিচিত। সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তুলনায় তার নেতৃত্বের ধরন কম কর্তৃত্ববাদী বলে মনে করা হয়। তবে রাজনৈতিক সমাবেশে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতেও তিনি পিছপা হন না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে।

তবে জেফরিসের প্রধান নির্বাচনী বার্তা ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট মোকাবিলা। ভোটারদের কাছে এটি বারবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে। জনসমক্ষে তার অন্যতম স্লোগান ছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাপন এখন অতিরিক্ত ব্যয়বহুল।’

এক জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সহযোগীর মতে, শিশুদের জন্য বর্ধিত কর ছাড় চালু করা, বাড়ি কেনা সহজ করতে আবাসন কর ছাড় দেওয়া, ইরান যুদ্ধের অবসান, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে ভর্তুকি ফিরিয়ে আনা এবং ওবামাকেয়ার স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচির কিছু ভর্তুকি পুনর্বহালের মতো কয়েকটি বিল দিয়ে কাজ শুরু করতে পারেন জেফরিস। এসব প্রস্তাবে দলের বিভিন্ন অংশের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর কিছুতে ট্রাম্প ভেটো দিতে পারেন।

আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতা করে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করা। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের ঋণ গ্রহণের সীমা বাড়ানো, যাতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি এড়ানো যায়; পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় অনুমোদন করা, যাতে সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে না যায়।

এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সুরক্ষা, মেডিকেইডে রিপাবলিকানদের কমানো ৯০০ বিলিয়ন ডলারের বরাদ্দ পুনর্বহাল এবং অভিবাসন আইন সংস্কারও ডেমোক্র্যাটদের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে।

মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থার্ড ওয়ের মুখপাত্র কেট ডিগ্রুইটার মনে করেন, প্রগতিশীলদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে অভিশংসনের দাবির বিষয়ে জেফরিসের সতর্ক থাকা উচিত। তার মতে, প্রেসিডেন্টকে ঘিরে বড় ধরনের অভিশংসন লড়াই শুরু করা কার্যকর হবে না।

আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারব্যবস্থা বিষয়ক অধ্যাপক ডেভিড মিলার বলেন, নবনির্বাচিত প্রগতিশীল সদস্যদের অনেকে ওয়াশিংটনে এসে প্রথম দিন থেকেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা করতে পারেন। কিন্তু হোয়াইট হাউস ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় তাঁদের সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয় করাই জেফরিসের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। সূত্র: আরব নিউজ