মরক্কো-স্পেন সীমান্তে অভিবাসীরদের ঢল, প্রাণ গেল ৯ জনের

মরক্কো থেকে হাজার হাজার অভিবাসী স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিউটায় (Ceuta) সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টাকালে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেন সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সিউটার স্থানীয় প্রশাসন সীমান্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী চাওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমান্তের বেড়া অতিক্রম করে স্পেনের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ে।

স্পেন সরকার জানিয়েছে, সিউটায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিভিল গার্ডকে সহায়তা দিতে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা শুক্রবার সিউটা সফর করবেন।

সীমান্তে দায়িত্বরত স্প্যানিশ সিভিল গার্ড সদস্যদের সংগঠনের প্রধান রাশিদ সিবিহি বলেন, "পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা সম্ভব নয়, তবে হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করছে। সীমান্ত ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।"

উত্তর মরক্কোর মানবাধিকার সংগঠন মরোক্কান অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান রাইটস-এর সদস্য আক্রাফ মাইমুনি পরিস্থিতিকে "ব্যতিক্রমী" বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সকালে তারাহাল  সীমান্ত খুলে দেওয়া হয় এবং এরপরই মানুষ সীমান্ত পার হতে শুরু করে।

ঘটনাস্থলের ভিডিওতে দেখা যায়, মূলত মরক্কোর নাগরিকদের বড় বড় দল তারাহাল সৈকতের ব্রেকওয়াটার ঘুরে স্থানীয় সড়কে উঠে আসছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই তরুণ পুরুষ হলেও নারী ও ছোট শিশু নিয়ে আসা পরিবারও ছিল। অনেককে "ভিভা এসপানিয়া!" (স্পেন দীর্ঘজীবী হোক) বলে স্লোগান দিতেও দেখা যায়।

এত বিপুলসংখ্যক মানুষ হঠাৎ কেন সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করল, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়।

সিউটায় স্পেন সরকারের প্রতিনিধি দপ্তর জানিয়েছে, বিশৃঙ্খলার মধ্যে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো না হলেও পানিতে কয়েকটি মরদেহ ভাসতে দেখা গেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সিউটায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়েও বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

এর আগের দিন বুধবারও সাঁতরে সিউটায় প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। এরপর বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এ বিষয়ে মরক্কো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

তবে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মরক্কো সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করছে। মরক্কোর পুলিশ সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করা বহু মানুষকে আটকাচ্ছে। একই সঙ্গে উভয় দেশ অবৈধভাবে সিউটায় প্রবেশকারীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।

এর আগে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সীমান্তের অখণ্ডতা রক্ষা করা হবে। তবে অভিবাসন সংকটের কারণে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার যে দাবি স্থানীয় প্রশাসন তুলেছে, তা আইনগতভাবে সম্ভব নয়।

সিউটার প্রশাসনের মতে, স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায় অভিবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। ওই রায়ে সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্থলপথে বা সীমান্তের বেড়া টপকে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে এ রায় প্রযোজ্য নয়।

অন্যদিকে, মরক্কোর কয়েকজন মানবাধিকারকর্মীর ধারণা, অধিকাংশ অভিবাসী আদালতের ওই রায় সম্পর্কে জানতেন না। তাই এটিই সীমান্তে মানুষের ঢলের প্রধান কারণ নয়।

স্পেন ইউরোপে উন্নত জীবিকা ও নিরাপত্তার আশায় আসা অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত সিউটায় পৌঁছাতে অনেক অভিবাসী মরক্কোর ফনিদেক (Fnideq) শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার সাঁতরে স্পেনের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। আবার কেউ কেউ তুলনামূলক কম দূরত্বের বেলিউনেশ (Belyounech) এলাকা থেকেও যাত্রা করেন।