অভিবাসীর খাবার 'হটডগ' যেভাবে আমেরিকার হলো

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম

এক কামড়ে নরম রুটি, তার ভেতর রসালো সসেজ। তার ওপর বেকনে মোড়ানো মাংস, পিন্টো বিন, পেঁয়াজ, টমেটো, মেয়োনিজ, ঝাল সস আর পাশে কাঁচামরিচ। দেখতে হট ডগ হলেও এটি আর সাধারণ হট ডগ নয়। সীমান্ত পেরিয়ে মেক্সিকোর স্বাদে বদলে যাওয়া এই খাবারই আজ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার টাকসন শহরের অন্যতম পরিচিত খাবার, সোনোরান হট ডগ।

তবে এই খাবারের গল্প শুরু হয়নি সোনোরা বা টাকসনে। এর শিকড় আরও পুরোনো, জার্মানভাষী অভিবাসীদের হাত ধরে উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা সসেজে। পরে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা নিজেদের স্বাদ, মসলা ও খাদ্যসংস্কৃতি মিশিয়ে খাবারটিকে বারবার নতুন রূপ দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে উঠেছে আমেরিকার জনপ্রিয়তম রাস্তার খাবারগুলোর একটি।

মেক্সিকোয় বদলে গেল হট ডগের চেহারা

মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সোনোরা অঙ্গরাজ্যে ঠিক কীভাবে হট ডগ পৌঁছেছিল, তার নিশ্চিত ইতিহাস নেই। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বেসবল দল কিংবা ভ্রাম্যমাণ সার্কাসের সঙ্গে খাবারটি সীমান্ত পেরিয়ে মেক্সিকোয় যায়।

এরপর সোনোরায় শুরু হয় তার নতুন জীবন। হট ডগের সঙ্গে যোগ হয় বিন, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন ধরনের সালসা। ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে হারমোসিয়োর সোনোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এটি জনপ্রিয় রাতের খাবারে পরিণত হয়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোয় যাওয়া খাবারটি সেখানে গিয়ে নিজের পুরোনো চেহারা ধরে রাখেনি; বরং স্থানীয় স্বাদে পুরোপুরি বদলে যায়।

এই সীমান্তবর্তী খাবারের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায় অবশ্য শুরু হয় আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর।

মেক্সিকো থেকে আবার যুক্তরাষ্ট্রে

সোনোরার নাকোজারি দে গার্সিয়া শহরে ছোটবেলায় বেঞ্জামিন গালাজ নামে এক কিশোরের পরিচয় হয় রোলান্দো মেন্ডিভিলের সঙ্গে। মেন্ডিভিল সেখানে নতুন ধরনের হট ডগ বিক্রি করতেন, বেকনে মোড়ানো, গ্রিল করা সসেজ, লম্বা রুটির ভেতর পিন্টো বিন, পেঁয়াজ, টমেটো, মেয়োনিজ ও সালসা দিয়ে সাজানো।

গালাজ খাবারটি এতটাই পছন্দ করতেন যে স্কুল শেষে বিক্রেতার দোকানে ঘোরাঘুরি করতেন। একসময় সেখানেই শিখে ফেলেন কীভাবে এই হট ডগ তৈরি করতে হয়।

১৯৯৪ সালে টাকসনে ব্যবসা শুরু করার পর গালাজ শহরটির প্রথম দিককার সোনোরান হট ডগ বিক্রেতাদের একজন হয়ে ওঠেন। খাবারটি সেখানে দ্রুত জনপ্রিয় হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্রেতা একসঙ্গে পাঁচ-ছয়টি হট ডগও খেতেন। বর্তমানে তার রেস্তোরাঁয় দিনে প্রায় এক হাজারটি সোনোরান হট ডগ বিক্রি হয়।

আজ টাকসনে প্রায় ২০০ জন বিক্রেতা এই বিশেষ ধরনের হট ডগ বিক্রি করেন। শহরটিতে রয়েছে আলাদা সোনোরান হট ডগ ট্রেইল, যেখানে খাবারপ্রেমীরা বিভিন্ন দোকান ঘুরে এই খাবারের নানা সংস্করণ চেখে দেখতে পারেন। টাকসনের বহুজাতিক খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্ব এতটাই যে ২০১৫ সালে শহরটি ইউনেস্কোর প্রথম সৃজনশীল গ্যাস্ট্রোনমি নগর হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

অভিবাসীদের খাবার থেকে আমেরিকান পরিচয়ের অংশ

হট ডগের জনপ্রিয়তা শুধু স্বাদের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাসও।

উনিশ শতকে পূর্ব ইউরোপ থেকে জার্মানভাষী অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসেন নানা ধরনের সসেজ। পরে আমেরিকার শহরগুলোতে রাস্তার পাশে সেগুলো বিক্রি শুরু হয়। অল্প পুঁজিতে খাবার বিক্রি করে আয় করার সুযোগ অনেক নতুন অভিবাসীর জন্য নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি পথ তৈরি করে দেয়।

এরপর একে একে অন্য অভিবাসী গোষ্ঠীগুলোও খাবারটিকে নিজেদের মতো করে সাজাতে শুরু করে। গ্রিকরা যোগ করেন দারুচিনি ও জায়ফলের ঘ্রাণযুক্ত উপকরণ, ইতালীয়রা দেন আচারজাত সবজি। নিউইয়র্কে বড় ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রভাবে জনপ্রিয় হয় সাওয়ারক্রাউট দিয়ে পরিবেশিত গরুর মাংসের হট ডগ। শিকাগোয় মরিচও একসময় হট ডগের পরিচিত উপকরণ হয়ে ওঠে।

ফলে হট ডগ একসময় শুধু জার্মান অভিবাসীদের খাবার থাকেনি। বিভিন্ন সংস্কৃতি, অভিবাসন আর স্থানীয় স্বাদের মিশ্রণে এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের আমেরিকান খাদ্য-সংস্কৃতির প্রতীক।

বর্ণবিদ্বেষের গল্পও আছে

তবে এই জনপ্রিয়তার পথ সবসময় মসৃণ ছিল না।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি জার্মান অভিবাসীদের নিয়ে নানা বিদ্বেষপূর্ণ গুজব ছড়ানো হতো। এমনকি ভিত্তিহীন গল্পও চালু হয়েছিল যে জার্মান কসাইরা নাকি প্রতিবেশীদের বিড়াল-কুকুর চুরি করে সসেজ তৈরি করতেন। খাদ্যকে কেন্দ্র করে অভিবাসীদের হেয় করার সেই প্রচারণা থেকেই হট ডগ নামটির জন্মের একটি তত্ত্বেরও কথা বলা হয়।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কলঙ্কিত অভিবাসী খাবারই আমেরিকার মূলধারার সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। উনিশ শতকের শেষ দিকে বেসবল মাঠে হট ডগ নিয়মিত খাবার হয়ে ওঠে। রাস্তার খাবারের দোকানে শ্রমিক থেকে ব্যবসায়ী, সব শ্রেণির মানুষ একই খাবার খেতেন। ফলে হট ডগ হয়ে ওঠে সামাজিক সমতার এক প্রতীকী ছবিও।

এমনকি রাজপরিবারের অতিথিরাও বাদ যাননি। সুইডেনের ক্রাউন প্রিন্সেস লুইস যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের স্ত্রী এলিনর রুজভেল্ট তাকে সরিষা দেওয়া হট ডগ পরিবেশন করেছিলেন। পরের বছর ব্রিটেনের রাজা ষষ্ঠ জর্জ ও রানি এলিজাবেথের সঙ্গে রুজভেল্ট পরিবারের এক পিকনিকেও হট ডগ পরিবেশিত হয়। সেই আয়োজন পরে পরিচিতি পায় হট ডগ সামিট নামে।

সীমান্তের দুই পাশে বদলে যাচ্ছে খাবার

সোনোরান হট ডগের গল্প অবশ্য এখানেই শেষ হয়নি। টাকসনের বিক্রেতারাও নিজেদের মতো করে খাবারটির নতুন নতুন সংস্করণ তৈরি করছেন।

এল গুয়েরো কানেলো নামের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁটি এখন দুটি বেকনে মোড়ানো হট ডগ দিয়ে বিশেষ সংস্করণ পরিবেশন করে। আবার এল সিনালোয়েন্সে হট ডগ কার্টে পাওয়া যায় নিরামিষ সোনোরান হট ডগ, যার ওপর থাকে মোটা করে কাটা কাঁচামরিচ।

আর মারিয়েল ফিগুয়েরো ২০১৯ সালে নিজের হট ডগের দোকান খোলার পর একদিন ভাবলেন, হট ডগের সঙ্গে মেক্সিকোর জনপ্রিয় ধীরে রান্না করা মাংস বিরিয়া যোগ করলে কেমন হয়। পরীক্ষাটি সফল হয়। এখন বিরিয়ায় সাজানো সোনোরান হট ডগই তার দোকানের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার। উজ্জ্বল লাল রুটিও তার নিজস্ব সংযোজন।

এমনকি বেঞ্জামিন গালাজও কয়েক দশক আগে সোনোরায় শেখা মূল রেসিপি পুরোপুরি অপরিবর্তিত রাখেননি। তিনি রুটির মিষ্টতা কমিয়েছেন এবং যোগ করেছেন জালাপেনো সালসা। এখন তার দুটি রেস্তোরাঁ রয়েছে। ভবিষ্যতে মেক্সিকোর কানকুনে নতুন শাখা খোলার কথাও ভাবছেন তিনি।

একসময় যে খাবার জার্মান অভিবাসীদের হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল, সেটি সীমান্ত পেরিয়ে মেক্সিকোয় গিয়ে নতুন স্বাদ পেয়েছে, আবার সেখান থেকে ফিরে এসে যুক্তরাষ্ট্রেরই একটি শহরের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। সোনোরান হট ডগের এই যাত্রা তাই শুধু একটি খাবারের ইতিহাস নয়, অভিবাসন, সংস্কৃতির আদান-প্রদান আর মানুষের হাতে খাবারের ক্রমাগত বদলে যাওয়ার গল্পও। সূত্র: সিএনএন

এএস
আরও পড়ুন