ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে আরব ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের পেছনে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরের উসকানিমূলক বক্তব্য ও কঠোর নীতিকে দায়ী করছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, বেন-গাভিরের আগ্রাসী বক্তব্য ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ডানপন্থীদের নির্বাচনী সমর্থন বাড়ানোর বদলে হাজার হাজার আরব ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করেছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলে ডানপন্থী জোটের নির্বাচনী সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বেদুইন শহর রাহাতে নির্বাচনের দিন ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছায়। আগের নির্বাচনে এই হার ছিল ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ। নেগেভ অঞ্চলের বিভিন্ন আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এবার ভোটদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলাফল প্রকাশের পর শহরটির আরব দলগুলোর নির্বাচনী কার্যালয়ে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তাদের ভাষায়, এই ভোটের মধ্য দিয়ে বেন-গাভিরকে এক ধরনের জবাব দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ ইসরায়েলে লিকুদের দীর্ঘদিনের কর্মী রামি রাহাতে নির্বাচনী পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তার ভাষ্য, ভোটের দিন শহরের রাস্তাঘাট ও ভোটকেন্দ্রগুলোতে বেন-গাভিরের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে। তিনি বলেন, মানুষের কথাবার্তায় বারবার বেন-গাভিরের নাম উঠে আসছিল। অতীতে লিকুদ বেদুইন জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে কিছু ভোট পেলেও এবার সেই সমর্থন প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। তার অভিযোগ, বেন-গাভিরের কর্মকাণ্ডই আরব ভোটারদের ঘর থেকে বেরিয়ে লিকুদের বিরুদ্ধে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
লিকুদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শিমন বোকারও বেন-গাভিরের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, বেন-গাভির ডানপন্থী শিবিরের বড় ধরনের ক্ষতি করেছেন এবং আরব দলগুলোর আসন বাড়াতে ভূমিকা রেখেছেন। বোকার বলেন, কৃষিজমি-সংক্রান্ত অপরাধ ও অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, এ বিষয়ে কারও আপত্তি নেই। তবে এ ধরনের সমস্যা সমাধানে উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা গণমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরির পরিবর্তে কার্যকর পদক্ষেপ ও সুষ্ঠু নীতি দরকার। তার মতে, বেন-গাভিরের ধারাবাহিক উসকানির প্রতিক্রিয়াতেই আরব ভোটাররা প্রতিবাদ জানাতে ব্যাপকভাবে ভোটকেন্দ্রে গেছেন।
রাহাতে ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্যও ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্বাচনের দিন স্থানীয় বাসিন্দারা বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবস্থা করে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দেন। শহরটির মেয়র তালাল আল-ক্রেনাউই ভোটার উপস্থিতি ৭৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, নেগেভ অঞ্চলের প্রায় দেড় লাখ সম্ভাব্য ভোটকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে চারটি আসন নিশ্চিত করা। বুথফেরত জরিপ প্রকাশের পর তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, তারা নিজেদের শক্তি দেখিয়েছেন। রাহাতে কে কর্তৃত্ব করবে, তা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল; এবার বাসিন্দারা নিজেদের অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছেন।
রাহাতের বাসিন্দারা জানান, তাদের প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য ছিল বেন-গাভিরের বাড়িঘর উচ্ছেদ নীতি ও আরব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে তার বক্তব্য। তাদের কেউ কেউ বলেন, নেতানিয়াহুর প্রতি তাদের নীতিগত কোনো বিরোধিতা নেই। অতীতেও নেগেভ অঞ্চলে তিনি ভোট পেয়েছেন। কিন্তু বেন-গাভির তাকে আরব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্রভাবিত করেছেন এবং এতে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
তবে বেন-গাভিরের দল ওৎজমা ইয়েহুদিতের সমর্থকেরা এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। দক্ষিণ ইসরায়েলে দলটির এক কর্মী রয় বলেন, আরব ভোটারদের সমর্থন হারানোর জন্য বেন-গাভিরকে দায়ী করা ঠিক নয়। তার দাবি, প্রান্তিক এলাকার অনেক বাসিন্দা শুরুতে বেন-গাভিরকে ভোট দেওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত পরিচিত দল লিকুদকেই বেছে নিয়েছেন। নেতানিয়াহুর দলকে বড় করার ওপর জোর দিয়ে পরিচালিত প্রচারণা এসব ভোট আবার লিকুদের দিকে টেনে নিয়েছে।
রয় আরও প্রশ্ন তোলেন, আরব নাগরিকদের ভোট দিতে যাওয়ার জন্য বেন-গাভিরকে দায়ী করা কতটা যুক্তিসংগত। তার মতে, আইন প্রয়োগ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং অপরাধ দমনের দায়িত্ব থেকে সরে আসার কারণ হতে পারে না ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান।
অন্যদিকে, নেগেভের হুরা এলাকার বাসিন্দা রায়েদ আবু আল-কিয়ান বলেন, আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি তৈরি হয়েছিল নিজেদের অবরুদ্ধ ও কোণঠাসা মনে করার কারণে। তার অভিযোগ, বেন-গাভির তাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন এবং বাড়িঘর ভাঙার ওপর গুরুত্ব দিলেও বিকল্প আবাসন বা পরিকল্পনার কোনো সমাধান দেননি। তিনি বলেন, বেন-গাভির শাসন ও নিরাপত্তার কথা বললেও বাস্তবে অপরাধ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোর মতো মৌলিক প্রয়োজনও উপেক্ষিত থেকেছে। তার মতে, জনগোষ্ঠীটির স্বার্থের বদলে তাদের দুর্ভোগকে রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার করাই শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে প্রতিবাদী অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে। সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট