একটি বিষধর সাপের উপদ্রব কমাতে আনা হয়েছিল মাত্র ৩০টি বেজি। উদ্দেশ্য ছিল খুবই সরল—সাপের প্রাকৃতিক শিকারি বেজি সাপের সংখ্যা কমিয়ে দেবে, আর তাতেই রক্ষা পাবে মানুষের জীবন ও পরিবেশ। কিন্তু প্রকৃতি মানুষের এই পরিকল্পনাকে মেনে নেয়নি। বরং মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে সেই ৩০টি বেজি হয়ে উঠল একটি দ্বীপের জন্য বড় হুমকি।
ঘটনাটি জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপের। আর এই ঘটনার সঙ্গে অপ্রত্যাশিতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম।
১৯৭৯ সালে জাপানের কাগোশিমা প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত সবুজে ঘেরা আমামি ওশিমা দ্বীপে বিষাক্ত ‘হাবু’ সাপের উপদ্রব কমাতে বেজি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পার্শ্ববর্তী ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে আনা হয় প্রায় ৩০টি ছোট ভারতীয় বেজি। ধারণা ছিল, বেজি সাপ শিকার করবে এবং প্রাকৃতিকভাবেই দ্বীপের পরিবেশে ভারসাম্য ফিরে আসবে।
কিন্তু পরিকল্পনাকারীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবের মধ্যেই রাখেননি—সাপ ও বেজির জীবনযাপনের সময় আলাদা।
হাবু সাপ মূলত নিশাচর। রাতের অন্ধকারে তারা শিকার খুঁজতে বের হয়। বিপরীতে বেজি দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ দিনের বেলায় বেজি যখন খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াত, তখন হাবু সাপ থাকত আড়ালে। আবার রাতে সাপ বের হলেও বেজি তখন বিশ্রামে।
ফলে যে প্রাণীকে সাপ নিধনের জন্য আনা হয়েছিল, তার সঙ্গে সাপের প্রায় দেখাই হলো না!
দ্বীপে বেজিদের উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাকৃতিক শত্রু ছিল না। ফলে দ্রুত তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সাপ শিকার করতে না পেরে ক্ষুধার্ত বেজিরা দ্বীপের অন্যান্য প্রাণীকে খাবার হিসেবে বেছে নেয়। বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ ও উভচর—কেউই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি।
বিশেষ করে আমামি দ্বীপের বিরল আমামি খরগোশ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়ে। প্রাচীন বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা এই প্রাণীটিকে অনেক সময় ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ বলা হয়। বেজির শিকারের কারণে আমামির সাতটি স্থানীয় প্রজাতি বিলুপ্তির কাছাকাছি চলে যায়।
১৯৭৯ সালে মাত্র ৩০টি বেজি দিয়ে যে অভিযান শুরু হয়েছিল, তার ফল কতটা ভয়াবহ হয়েছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় সংখ্যায়।
২০০০ সালের মধ্যে আমামি ওশিমায় বেজির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছায়।
অর্থাৎ সাপ কমানোর জন্য আনা বেজিই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে দ্বীপের প্রাণবৈচিত্র্যের অন্যতম বড় শত্রু। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার বদলে মানুষ নিজের হাতে তৈরি করেছিল নতুন একটি পরিবেশগত সংকট।
ভুলের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে জাপান সরকার বেজি নির্মূলের উদ্যোগ নেয়। ১৯৯৩ সাল থেকে স্থানীয় পর্যায়ে এবং ২০০০ সাল থেকে জাতীয়ভাবে পুরো দ্বীপজুড়ে অভিযান শুরু হয়।
প্রায় ৭১২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এলাকায় বসানো হয় প্রায় ৩০ হাজার ফাঁদ ও সেন্সর ক্যামেরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠন করা হয় বিশেষ দল—‘আমামি মঙ্গুস বাস্টার্স’।
২০১৮ সালের এপ্রিলে সর্বশেষ একটি বেজি ধরা পড়ে। কিন্তু তাতেই অভিযান শেষ হয়নি। আরও ছয় বছর ধরে দ্বীপজুড়ে চালানো হয় নিবিড় পর্যবেক্ষণ। কোথাও বেজির অস্তিত্ব পাওয়া না যাওয়ার পর অবশেষে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আমামি ওশিমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেজিমুক্ত ঘোষণা করে জাপান সরকার।
প্রায় পাঁচ দশকের এই দীর্ঘ লড়াইকে পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অসাধারণ সাফল্য হিসেবে দেখছেন। বড় একটি ভৌগোলিক এলাকা থেকে আক্রমণাত্মক শিকারি প্রাণী নির্মূলের এই ঘটনা সংরক্ষণ ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এই ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো—আমামির সেই বেজিদের শিকড়ের সন্ধান মেলে বাংলাদেশে।
ঐতিহাসিক তথ্য ও গবেষণা অনুযায়ী, ১৯১০ সালেই বাংলাদেশ থেকে ছোট ভারতীয় বেজি জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে নেওয়া হয়েছিল। পরে ওকিনাওয়া থেকে অন্তত ৩০টি বেজি ১৯৭৯ সালে আমামি ওশিমায় নিয়ে যাওয়া হয়।
গবেষকেরা ঐতিহাসিক তথ্য ও ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ওকিনাওয়া এবং সেখান থেকে আমামি ওশিমা পর্যন্ত বেজির এই দীর্ঘ ভৌগোলিক যাত্রার প্রমাণ পেয়েছেন।
অর্থাৎ প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মানুষের হাত ধরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়ানো একটি ছোট প্রাণী শেষ পর্যন্ত জাপানের একটি দ্বীপের পরিবেশে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছিল।
আসলে এই গল্পে বেজিকে দোষী বলা কঠিন।
বেজিগুলো নিজের ইচ্ছায় আমামি ওশিমায় যায়নি। মানুষই তাদের সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের বলা হয়নি যে হাবু সাপ শিকার করতে হবে। বরং নতুন পরিবেশে গিয়ে তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে খাবারের সন্ধান করেছে। সহজলভ্য যেসব প্রাণীকে তারা শিকার করতে পেরেছে, সেগুলোকেই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।
অর্থাৎ সমস্যার শুরু হয়েছিল মানুষের একটি পরিবেশগত সিদ্ধান্ত থেকে।
আমামি ওশিমার ঘটনা পরিবেশবিজ্ঞানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একটি বাস্তুতন্ত্রের কোনো একটি প্রাণীকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা অন্য একটি প্রাণীকে সেখানে এনে ছেড়ে দেওয়া যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে বিষয়টি ততটা সরল নয়।
একটি প্রাণী খাদ্যশৃঙ্খলের কোন স্তরে আছে, তার প্রাকৃতিক শত্রু কারা, কোন সময়ে সক্রিয় থাকে, কী খায় এবং নতুন পরিবেশে তার বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনা কতটা—এসব বিষয় বিবেচনা না করে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—প্রকৃতির সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে প্রকৃতির নিয়মকে উপেক্ষা করা হলে সেই সমাধানই একসময় নতুন সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
হাবু সাপ তাড়াতে জাপানে যে বেজি আনা হয়েছিল, প্রায় ৫০ বছর পর সেই বেজি তাড়াতেই ব্যয় করতে হয়েছে বিপুল সময়, অর্থ ও শ্রম। অথচ যে হাবু সাপকে কেন্দ্র করে পুরো আয়োজন—সেই বিষাক্ত সাপ এখনো আমামি ওশিমার জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।