কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে সম্পূর্ণ মেডিকেল চেকআপের জন্য ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিচারপতি শহীদ ওয়াহিদের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই রায় দেন, যেখানে বিচারপতি নাঈম আখতার আফগান ও বিচারপতি ইশতিয়াক ইব্রাহিমও ছিলেন। ইমরানের হাসপাতালে ভর্তি এবং পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়ে দায়ের করা একাধিক আবেদনের ভিত্তিতে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।
গত মে মাসে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে ইমরান নিজেই শিফা হাসপাতালে স্থানান্তর, ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরিবারকে তার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের নির্দেশনা চেয়েছিলেন।
আদালত শিফা হাসপাতালে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে পরীক্ষার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি জেল কর্তৃপক্ষকে ইমরানের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সাপ্তাহিক সাক্ষাৎ এবং ছেলেদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
আদালত বলেছে, ইমরানের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে থাকায় এবং সংবিধানের ৯ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত থাকায় এই আদেশ জারি করা হয়েছে। বিচারপতি ওয়াহিদ বলেন, বন্দির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই মৌলিক অধিকারের কথা মাথায় রেখে আদেশ দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল চৌধুরী আমির রেহমান ইমরানকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের বিরোধিতা করার পরই আদালত এই নির্দেশনা দেয়। তার যুক্তি ছিল, সরকারকে এ বিষয়ে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি বলে এই মুহূর্তে বন্দিকে বেসরকারি হাসপাতালে সরানো যাবে না। তবে বিচারপতি ওয়াহিদ আদেশ লেখার সময় উল্লেখ করেন, বিরোধিতা সত্ত্বেও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানিতে অংশ নিয়েছেন।
আদালত-নির্ধারিত মেডিকেল বোর্ডে থাকবেন একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, একজন সাধারণ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ফয়সাল সুলতান। ইমরানের বোন ও অন্যতম আবেদনকারী ডা. উজমা খানকেও এই মেডিকেল পরীক্ষায় যুক্ত রাখা হবে। আবেদনকারীর নিশ্চয়তা অনুযায়ী, সম্পূর্ণ চেকআপের সব খরচ বহন করবে ইমরানের পরিবার ও সংশ্লিষ্টরা।
আদালতের আদেশে কিছু শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বন্দির পরিবার, মামলার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক বা আইনজীবী কেউই হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের তৈরি প্রতিবেদন গণমাধ্যম বা জনসাধারণের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবেন না, কিংবা তা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবেন না। আদেশ লঙ্ঘন করা হলে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া এই সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। সরকার যদি মনে করে এই সুবিধার অপব্যবহার হচ্ছে, তাহলে তারা আদালতে আবেদন করতে পারবে, আবার সরকারের অনীহা দেখা দিলে আবেদনকারীপক্ষও আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবে।
এছাড়া ইমরানের দল, পরিবারের সদস্য ও মামলার সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীদের নিশ্চিত করতে হবে যে শিফা হাসপাতাল চত্বরের আশপাশে কোনো জনসমাবেশ বা মিছিলের আয়োজন করা হবে না। মামলার অসমাপ্ত অংশের শুনানি হবে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর।
এই রায়ের আগের দিন আদিয়ালা কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট সুপ্রিম কোর্টে ইমরানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে এই কারাগারেই বন্দি রয়েছেন ইমরান। প্রতিবেদনে জেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ইমরান ও তার স্ত্রীকে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দিনে তিনবার চিকিৎসক দল ইমরানকে দেখতে যান, খাবার পরীক্ষা করেন এবং রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন ও অক্সিজেন স্যাচুরেশনের মাত্রা রেকর্ড করেন।
তবে প্রতিবেদনের একটি সংযুক্তিতে বলা হয়েছে, পিমসের ডা. আখতার আলী বান্দেশাহ গত ১ আগস্ট ইমরানকে পরীক্ষা করে অনিয়ন্ত্রিত ও ওঠানামা করা রক্তচাপ, বুক ধড়ফড় করা, মাথাব্যথা ও অস্থিরতার অভিযোগ পেয়েছেন। ৭৪ বছর বয়সী এই পিটিআই নেতা নিজের এসব উপসর্গ ও মানসিক চাপের কারণ হিসেবে স্ত্রী, পরিবার ও সামাজিক যোগাযোগের সীমিত সুযোগ এবং পত্রিকা-টিভির অনুপস্থিতিকে দায়ী করেছেন।
চিকিৎসক মানসিক চাপ কমানোর নানা পরামর্শ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে স্ত্রীর সঙ্গে আরও ঘন ঘন সাক্ষাৎ এবং পড়ার সামগ্রী সরবরাহের সুযোগ। তিনি একটি সিটি করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি এবং রক্তচাপের ওষুধ বাড়ানোরও সুপারিশ করেছেন, কারণ জটিলতার ঝুঁকিতে রয়েছেন এই বর্ষীয়ান নেতা।
গত ১০ আগস্ট মাথায় ভারী অনুভূতি ও বুক ধড়ফড় করার অভিযোগের পর পিমসের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি মেডিকেল বোর্ড তাকে পরীক্ষা করে বলে সুপ্রিম কোর্টকে জানানো হয়েছে। এই বোর্ড প্রতিদিন এক ঘণ্টা হাঁটাচলা ও কারাগারের রুটিনে কিছুটা শিথিলতার পাশাপাশি পত্রিকা, ম্যাগাজিন, টেলিভিশন ও বই পড়ার সুযোগ দেওয়ারও সুপারিশ করেছে। পরিবারের সদস্য বা স্ত্রীর সঙ্গে আরও ঘন ঘন যোগাযোগ তার উদ্বেগ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে বলেও মত দিয়েছে বোর্ড।
প্রতিবেদনে ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিমস) তার চোখের চিকিৎসার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। জানা গেছে, বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসায় তার দৃষ্টিশক্তি প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে এসেছে। জানুয়ারির শেষদিকে ধরা পড়া চোখের সমস্যা-রাইট সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেইন অক্লুশন (সিআরভিও), এর চিকিৎসার জন্য ইমরানকে এর আগেও একাধিকবার পিমসে নেওয়া হয়েছিল।
এদিকে ইমরানের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিতে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের রাজনীতি। বিরোধী দলটি দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছিল, ইমরানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে চিকিৎসা করানো হোক এবং পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হোক।