ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার সময় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে ককক্রোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের আটক করা হয় বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এ সময় তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদেরও আটক করা হয়। তাঁদের কয়েকজনকে দিল্লির ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নেওয়া হয়েছে। খবর এনডিটিভি, রয়টার্স ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের।
দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ এলাকায় পুলিশ বাধা দিলে বাসস্ট্যান্ডে বসে প্রতিবাদ জানান তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মুখে ছিল ব্যান্ডেজ। এ সময় তাঁর সঙ্গে দলের একাধিক সংসদ সদস্যও ছিলেন।
মমতাকে আটক করার পর তৃণমূলের সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন ও দোলা সেনসহ পাঁচজন সংসদ সদস্যকে পুলিশ বাসে তুলে নিয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের বাসের ভেতর থেকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় মমতা বলেন, ‘সরকার আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে।’ তিনি আরও বলেন, জনগণের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী করতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ তাদের লড়াই চালিয়ে যাবে।
দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাসভবনের চারপাশে সকাল থেকেই পুলিশ মোতায়েন ছিল। বিক্ষোভে যোগ দিতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকেও আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ও সিপিআই(এম)-এর সংসদ সদস্য জন ব্রিটাসকেও আটক করে ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নেওয়া হয়।
জন ব্রিটাস পুলিশের আচরণের সমালোচনা করে বলেন, তাঁদের সঙ্গে ন্যূনতম সৌজন্যও দেখানো হয়নি। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের প্রায় এক ঘণ্টা বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানোর পর স্টেডিয়ামে নিয়ে যায়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছে। শুক্রবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র প্রতিনিধিরা। ওই বৈঠকে তাঁরা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ তুলে ধরেন।
বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনসহ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং এর ফলে ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং গত দুই বছরে অনুষ্ঠিত সব বিধানসভা নির্বাচন বাতিলের দাবিও জানান।
বৈঠকের পর লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, রাষ্ট্রপতি তাঁদের ‘নির্বাচনী চুরি’র অভিযোগ অস্বীকার করেননি—এতে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তবে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানায়, রাষ্ট্রপতি বিরোধীদের অভিযোগ মেনে নিয়েছেন—রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়।
রাহুল গান্ধী আরও জানান, সোমবার তাঁরা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। বিরোধী জোটের ভাষ্য, অভিযোগের নিষ্পত্তিতে তাঁরা সব ধরনের সাংবিধানিক ও আইনি পথ ব্যবহার করতে চান।
সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যন্তর মন্তরের আশপাশে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। শহরের কয়েকটি এলাকায় যান চলাচল এবং যোগাযোগব্যবস্থাতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, অনুমতি না পাওয়া কর্মসূচি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীরা নির্বাচনী স্বচ্ছতার দাবিতে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের বিপরীতে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত নাম এবং অযোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সংশোধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এ অবস্থায় দিল্লিতে বিরোধী নেতাদের আটক, বিক্ষোভে বিধিনিষেধ এবং সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ভারতের নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।