দাওয়াত না পাওয়ায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী পাঠাতে মাতবরের নিষেধাজ্ঞা!

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম

এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণে অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দেওয়ায় সভা ডেকে এলাকার অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থীর স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন মাতবর। ঘটনাটি ঘটেছে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ভাষাণচর ইউনিয়নের চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে তাদের নির্মাণকাজ উদ্বোধনের বিষয়টি জানায়। ফলে অনুষ্ঠানে কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ পাননি তারা। ওই অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় প্রভাবশালী মাতবর কামরুল হাসান। তিনি স্থানীয় অভিভাবকদের নিয়ে একটি সভা করে শিক্ষার্থীদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে বলেন।

মাতবর কামরুল হাসান (৪৩) ভাষাণচর ইউনিয়নের নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দুই নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তার বাবা মৃত আবুল কালাম ভাষাণচর ইউপির দুই নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছিলেন। কামরুল বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি দাওয়াত না পাওয়ায় প্রায় ৩০ শিক্ষার্থী চারদিন ধরে বিদ্যালয়ে যাচ্ছেনা। কয়েকজন অভিভাবক জানান,  কামরুল হাসান এলাকার প্রভাবশালী মানুষ। তার নির্দেশের পর সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারছেন না তারা।

১৯৮৭ সালে ৩৩ শতাংশ জমির উপর চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়। এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে চারজন শিক্ষক ও  ১০৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভবন উদ্বোধনের আগে নিয়মিত ৬৫ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকত। তবে গত চার দিন ধরে বিদ্যালয়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের মতো শিক্ষার্থী উপস্থিত হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, হঠাৎ করে এতসংখ্যক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে না আসায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পাঁচ-ছয় জন শিক্ষার্থী টিসি নিয়ে গেছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আলী খান বলেন, ভবনের নির্মাণকাজের উদ্বোধনের বিষয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে আমাদের জানায়। ফলে আমরা কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ পাইনি। বিষয়টি কামরুল হাসানকে বুঝিয়ে বলেছি। কিন্তু তিনি আমাদের কথা শোনেননি। তিনি ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে স্থানীয়  অভিভাবকদের নিয়ে তার বাড়ির পাশের নুর ইসলামের চায়ের দোকানে মিটিং করেন। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের এই স্কুল থেকে সরিয়ে নিতে বলেন।

ভাষাণচর ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান সদস্য (মেম্বার) মো. ফরিদ হোসেন বলেন, কামরুল হাসান হলেন নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী এলাকার মাতুব্বর। তিনিই ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন। ভাষানচর ইউপি চেয়ারম্যান মো. গোলাম কাওসার বলেন, স্কুলে কোলচুরী এলাকার শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে না এ বিষয়টি তিনি জেনেছেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে তনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অভিযুক্ত কামরুল হাসান বলেন, আমার বাড়ি ওই এলাকায় হলেও সরকারি চাকরির সুবাদে আমি ফরিদপুর শহরে থাকি। ওই বিদ্যালয় পড়াশোনা হয় না বলে হয়তো অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের অন্য স্কুলে ভর্তি করতে চাইছেন। এ ব্যাপারে এলাকার মাতবর হিসেবে তার নাম আসার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কেউ হয়তো শত্রুতা করে এ কথা বলছে। অথচ এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।’

সদরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

জেএম
আরও পড়ুন