ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের ধারক-বাহক মণিপুরী ললিতকলা

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৩, ০৬:১৩ পিএম

সালাহউদ্দিন শুভ, (কমলগঞ্জ) মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নে ঢুকলে চোখে পড়বে ধলাই নদী। এই নদীর তীর ঘেঁষা রাস্তা ধরে একটু সামনে অগ্রসর হলেই মিলে যাবে লাল ইটের এক দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন। মণিপুরি শাড়ির পাড়ের নকশা মৈরাং এর আলপনা দিয়ে করা হয়েছে এই ভবনের নকশা। এই ভবনটি প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই অঞ্চলের সকল প্রান্তিক নৃগোষ্ঠীদের সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিকাশের জন্য স্থাপিত হয়েছে। গত বছর সদ্য নির্মিত নতুন ভবনে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হলেও এই একডেমির ইতিহাস কিন্তু আরও পুরোনো।

এদিকে স্থানীয়রা জানান, বর্তমান উপ-পরিচালক (কমলগঞ্জ ইউএনও) সিফাত উদ্দিন আসার পর ও দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পাল্টে গেছে একাডেমির চিত্র। নিত্য নতুন অনুষ্ঠান হচ্ছে যা সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তবে এমন সংস্কৃতি বান্ধব উপ-পরিচালক এই একাডেমির জন্য দরকার ছিল তা পেয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর মণিপুরীদের মধ্যে কমলগঞ্জ মাধবপুর জোড়া মন্ডপের ব্রাম্মন পরিবার একাডেমির জন্য এই জায়গা দান করেন। ১৯৭৬ সালে সর্বপ্রথম মণিপুরী সমাজ কল্যাণ সীমিতর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি দীননাথ সিংহ মণিপুরীদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের দাবি পেশ করেন গণবভনে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৭ সালে মণিপুরী ললিতকলা একাডেমিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন কার্যকর হওয়ার পর ২০১০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি এই আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২২ সালের ৮ নভেম্বর প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যায়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থয়ানে ৪ তলা বিশিষ্ট আধুনিক ললিতকলা একাডেমি, গেস্ট হাউজ ও ডরমিটরি ভবন নির্মান করা হয়েছে।

এদিকে একাডেমি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মণিপুরী ললিতকলা একাডেমীতে চলমান প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে মণিপুরি নৃত্য, সাধারণ নৃত্য, মৃদঙ্গ প্রশিক্ষণ, তবলা প্রশিক্ষণ, সাধারণ সংগতি, মণিপুরী সংগিত, নাটক, কম্পিউটার, সেলাই, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও বর্ণমালা ও তাতঁ প্রশিক্ষণ। নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পাশাপাশি এখানে স্বল্প মেয়াদি বিভিন্ন সার্টিফিকেট কোর্স চালু রয়েছে। এ ছাড়া একাডেমির কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে মণিপুরীদের ইতিহাস ঐতিহ্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গবেষণা করা হয়। মণিপুরী সংস্কৃতির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নানান উৎসব, বিভিন্ন বিষয়ে পুস্তক-সাময়িকী প্রকাশনা, নাটক, সেমিনার-কর্মশালাসহ জাতীয় দিবস উদযাপন করা হয়।

বর্তমানে মৃদঙ্গ ও ত্রিপুরি নৃত্যের সাতদিন ব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একাডেমির নামের মধ্যে কেবল মণিপুরী নৃগোষ্ঠীদের নাম থাকলেও মূলত এই প্রতিষ্ঠানটি সাঁওতাল,গারো, নিলয়, লোহার, চা শ্রমিক, শব্দকার, রবিদাশ, খাসি, ত্রিপুরা, মুন্ডা, উঁরাওসহ ১৯টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা এখানকার বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। একাডেমি থেকে বিষয় ভিত্তিক প্রায় তিন শতাধিক প্রশিক্ষনার্থীরা প্রতি বছর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ২০১০ সালে এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৭টি দেশের মধ্যে নৃত্য পরিবেশন করে এই একডেমির নৃত্যদল সাফল্য অর্জন করেছিল। এছাড়া ২০১৯ সালে ফ্রান্স সরকারের আমন্ত্রণে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একাডেমির মৃদঙ্গ বাদকদল বাদ্যের তালে তালে নৃত্য পরিবেশ করে আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জন করেছে। এই এলাকার মানুষের গর্বের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমি।

স্থানীয় মণিপুরী সমাজের নেতাদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, বর্তমানে একাডেমির চিত্র ভিন্ন যা আগে ছিল না। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নতুন করে ফিরে পাচ্ছে একাডেমির মাধ্যমে। সকল নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক চর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে একাডেমি।

মণিপুরী সমাজ কল্যাণ সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আনন্দ মোহন সিংহ বলেন, ১৯৭৭ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে এ একাডেমিটি ছোট কলেবরে কার্যক্রম শুরু করলেও অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে দীর্ঘ পরিক্রমা অতিক্রম করে এই একাডেমি বর্তমানে সিলেট অঞ্চলের সকল নৃ-গোষ্ঠির সাংস্কৃতিক চর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নিয়মিত না হলেও একাডেমি থেকে মাঝে মাঝে ম্যাগাজিন বের হয়। নৃ-গোষ্ঠিদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উপর নিয়মিত গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশের কথা থাকলেও তা নিয়মিত নয় এখন। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে একাডেমির চিত্র পাল্টে গেছে। প্রায় প্রতি মাসে বলতে গেলে কোন না কোন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন শতাধিক ছাত্র ছাত্রী। একাডেমিতে শিক্ষা অর্জন করে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

এ ব্যপারে একাডেমির গবেষক প্রভাস কুমার সিংহর সাথে কথা বললে তিনি জানান যে, নৃ-গোষ্ঠীদের উপর গবেষণাধর্মী লেখা সংগ্রহ অত্যন্ত দূরহ ব্যপার। তবে চলতি বছর নতুন ভবনে নতুন উদ্যোমে আমরা গবেষণার কাজ শুরু করব। এ ছাড়াও বর্তমান উপ-পরিচালক (কমলগঞ্জ ইউএনও) সিফাত উদ্দিন স্যারের নির্দেশক্রমে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক চর্চার প্রশিক্ষন দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও একাডেমির মাধ্যমে বর্তমানে মৃদঙ্গ ও ত্রিপুরি নৃত্যের সাতদিন ব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

খাসি জনগোষ্ঠীদের সিলেট অঞ্চলের নেতা সুচিয়ান কডোর বলেন, একাডেমির নতুন ভবন এ কার্যক্রম শুরু হবার পর সকল জনগোষ্ঠীর মধ্য নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। এখন সবাই একাডেমিতে সুযোগ পাচ্ছে নানা প্রশিক্ষণের, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। 

ত্রিপুরা গ্রাম প্রধান রাধামোহন দেববর্মা বলেন, একাডেমির আয়োজনে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নৃত্য প্রশিক্ষণ আয়োজনে আমরা আনন্দিত আমাদের ছেলে মেয়েরা এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও পারদর্শী হতে পারবে ও হারিয়ে যাওয়া নৃত্যকে ফিরিয়ে আনতে পারবো। মণিপুরী ললিতকলা একাডেমি মণিপুরী নৃগোষ্ঠীসহ অপরাপর সকল নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক বিকাশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণসহ সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ সহ সাংস্কৃতিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

মণিপুরী ললিতকলা একাডেমির উপ পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিফাত উদ্দিন একাডেমির সার্বিক কার্যক্রম সম্বন্ধে তিনি বলেন, মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিকে সরকার একটি সত্যিকার অর্থের ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভূক্তিমূলক ইন্সটিটিউশান হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে। সেই লক্ষেই আমরা কাজ করছি। কিছুদিন পূর্বে প্রথমবারের মত আমরা সাঁওতালদের সোহরাই উৎসব আয়োজন করেছি। শব্দকরদের ধামাইল উৎসব, মণিপুরীদের বিষু উৎসব হয়েছে এই একাডেমির আয়োজনে। আমরা এখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব রাখব কিভাবে এখানে ঢাকা অথবা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়।

#এসএ

আরও পড়ুন