বরিশালে বাবা ছেলের বিরুদ্ধে প্রবাসে নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ০১:০৮ পিএম

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার দুই যুবককে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রবাসী বাবা-ছেলের বিরুদ্ধে। বিপুল পরিমান অর্থের নিয়ে কম্বোডিয়ায় নিয়ে শারীরিক নির্যাতন ও জিম্মি করে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকান্ডে জড়াতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযুক্তরা আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন বেপারী ও তার ছেলে সিয়াম হোসেন। তারা দুজনই কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

ভুক্তভোগী আরিফ হোসেন জানান, কামাল হোসেন বেপারী তাকে বৈধ কোম্পানির অফিসিয়াল কম্পিউটার ভিত্তিক চাকরির প্রলোভনে মাসিক দেড় লাখ টাকা বেতন দেওয়ার কথা বলে এবং এক বছরের ভিসাসহ ওয়ার্ক পারমিটের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তাকে এক বছরের ভিসা দেওয়ার কথা থাকলেও মাত্র তিন মাসের ভিসা দেওয়া হয়েছে। ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসার বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে মারধর করা হয়। 

তিনি আরো জানান, তার পাসপোর্ট কামাল হোসেন নিজের কাছে রেখেছেন। চার মাসেরও অধিক সময় ধরে কাজ করার পরেও তাকে বেতনের টাকা পরিশোধ করেননি। বেতন ও বৈধ কাগজপত্রের দাবি জানালে তাকে কামাল ও তার ছেলে সিয়াম একাধিকবার শারীরিক নির্যাতন করেছেন। এছারাও বিভিন্ন সময়ে চার দফায় তার  কাছ থেকে কামাল হোসেন মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। ‎কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তিনি দেখতে পেয়েছেন প্রতিশ্রুত চাকরির সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। অফিসিয়াল চাকরির পরিবর্তে তাকে বিভিন্ন মানুষের সাথে যোগাযোগ করে কথিত ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের কাজ করতে বাধ্য করেন। দুই বাবা ছেলের নির্দেশে প্রতারণার কাজ না করলেই ওই দুই যুবককে অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছে। বর্তমানে তারা কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন শহরে চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন।

‎আরিফ হোসেন জানান, তাকে এক বছরের ভিসা দেওয়ার কথা থাকলেও মাত্র তিন মাসের ভিসা দেওয়া হয়েছে। ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসার বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে মারধর করা হয়। অভিযোগ করে আরিফ বলেন, আমার পাসপোর্ট কামাল হোসেন তার কাছে রেখেছেন। চার মাসেরও অধিক সময় ধরে কাজ করার পরেও তাকে বেতনের টাকা পরিশোধ করা হচ্ছেনা। বেতন ও বৈধ কাগজপত্রের দাবি জানালে তাকে একাধিকবার শারীরিক নির্যাতন করেছেন।

আরিফ হোসেন অভিযোগ করেন, কম্বোডিয়ায় গিয়ে তিনি কামাল হোসেন ও সিয়ামের এমন একটি প্রতারক চক্রের কার্যক্রম দেখতে পেয়েছেন। যারা বিভিন্নধরনের সাইবার প্রতারণামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করছেন। তার (আরিফ) দাবি, চক্রটি বিভিন্ন ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ-নগদ) সংক্রান্ত প্রতারণা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো অপরাধের সাথে জড়িত রয়েছেন। চক্রটির অধীনে একাধিক টিম কাজ করে এবং তাকেও এসব কর্মকান্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে আপত্তি জানালে এবং নিজের পাওনা বেতন ও বৈধ কাগজপত্র দাবি করলে তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। 

একই অভিযোগ করেছেন, আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের পূর্ব সুজনকাঠী গ্রামের বাসিন্দা সৌরভ মোল্লা। তার দাবি, কামালের প্রলোভনে পরে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তাকেও বৈধ প্রতিষ্ঠানে অফিসিয়াল চাকরি ও মাসিক এক লাখ টাকা বেতনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও তাকে কোনো বেতন দেওয়া হয়নি। বরং বিদেশে থাকা ও খাওয়ার খরচ চালানোর জন্য পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে কয়েক দফায় টাকা পাঠাতে হয়েছে।

আরিফের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলে আরিফ সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অনেক কষ্টে ধারদেনা করে, জমিজমা ও সহায় সম্বল বিক্রি করে কামাল হোসেনের দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করে তাকে  বিদেশ পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দালাল কামালের খপ্পরে পরে বর্তমানে আমরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। আমার ছেলে এখন কম্বোডিয়ায় অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। আমার ছেলেকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনাসহ জড়িত দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

‎অপরে আরেক ভুক্তভোগীর বাবা জাহাঙ্গীর মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, ভাগ্যের চাকা বদলের আশায় ধারদেনা করে ও জমিজমা বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছি। দালালের চক্করে পরে আজ আমি সর্বস্বান্ত। আমার ছেলেকে বৈধ কোম্পানির অফিসিয়াল কাজ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দালাল কামাল হোসেন ও তার ছেলে সিয়াম আমার ছেলে সৌরভকে বিভিন্ন অবৈধ কাজ করতে বাধ্য করছেন। 

অভিযোগের ব্যাপারে অভিযুক্ত সিয়াম হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, আরিফকে আমি বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি এবং সৌরভকে আমার বাবা বিদেশে নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ওই দুই যুবককে কনস্ট্রাকশন খাতে কাজের উদ্দেশ্যে ভিসা দেওয়া হয়েছিল। তবে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর তারা নির্মাণকাজে যুক্ত না হয়ে নিজেরাই অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরেছেন।

ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য বৈধ কাগজপত্র নিজেদের হেফাজতে রেখে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ কামাল হোসেন বেপারী সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেও দীর্ঘসময় ধরে বেতন-ভাতা পরিশোধ না করার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।

‎এব্যপারে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিখন বনিক বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হবে। পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

MCH/SN
আরও পড়ুন