ছয় শতাব্দীর ইতিহাস সোনারগাঁয়ের গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম

ইতিহাসের পাতায় যাঁর নাম জড়িয়ে আছে বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনের গৌরব, ন্যায়বিচার, সাহিত্যচর্চা এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সঙ্গে—সেই সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ আজও যেন নীরবে ঘুমিয়ে আছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের শাহচিল্লাপুর গ্রামের একটি কালো পাথরের সমাধিতে। প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই সমাধি শুধু একজন শাসকের শেষ ঠিকানাই নয়, বরং মধ্যযুগীয় বাংলার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য দলিল।

একসময় বাংলার রাজধানী হিসেবে খ্যাত সোনারগাঁ ছিল বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র। সেই ঐতিহাসিক জনপদের শাহচিল্লাপুর গ্রামে অবস্থিত গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের সমাধি আজও দেশ-বিদেশের ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সময়ের প্রবাহে চারপাশের জৌলুস কিছুটা ম্লান হলেও এই সমাধির গুরুত্ব একটুও কমেনি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা থেকে অল্প দূরেই অবস্থিত সমাধিটি। স্থানীয়দের কাছে এটি বেশি পরিচিত ‘কালা দরগা’ নামে। কালো কষ্টি পাথরে নির্মিত হওয়ায় এমন নামকরণ। বাংলাদেশের প্রাচীন সমাধিগুলোর মধ্যে সম্পূর্ণ কষ্টি পাথরে নির্মিত এমন স্থাপনা অত্যন্ত বিরল।

স্থাপত্যের দিক থেকেও এটি অনন্য। প্রায় ১০ ফুট দীর্ঘ, ৫ ফুট প্রশস্ত এবং ৩ ফুট উঁচু মূল সমাধির ওপর রয়েছে আরও দেড় ফুট উঁচু অর্ধবৃত্তাকার বিশাল কষ্টি পাথরের আবরণ। সমাধির কার্নিশজুড়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ, দুই পাশে তিন খাঁজবিশিষ্ট খিলান এবং খিলানের ভেতরে প্রলম্বিত শিকল ও ঝুলন্ত ঘণ্টার নকশা মধ্যযুগীয় বাংলার শিল্পরুচি ও কারিগরি দক্ষতার অসাধারণ নিদর্শন বহন করে। শত শত বছর পেরিয়েও পাথরের গায়ে খোদাই করা অলঙ্করণ দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে।

সমাধিটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯২০ সালের ২২ নভেম্বর তৎকালীন সরকার এটিকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর সংস্কারকাজ সম্পন্ন করে। বর্তমানে সমাধির পাশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সতর্কীকরণ ফলক রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, পুরাকীর্তির কোনো ধরনের ক্ষতি, বিকৃতি বা পরিবর্তন করলে পুরাকীর্তি আইন, ১৯৭৬ অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে।

ন্যায়পরায়ণ শাসক, সাহিত্যপৃষ্ঠপোষক

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৩৮৯ থেকে ১৪১০ সাল পর্যন্ত প্রথম ইলিয়াস শাহি রাজবংশের তৃতীয় সুলতান ছিলেন গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ। সিংহাসনে আরোহণের আগে তাঁর নাম ছিল আযম শাহ। ক্ষমতায় বসার পর তিনি ‘গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে তিনি পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করলেও রাজত্বকালে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে। তাঁর শাসনামলে শিক্ষা, সাহিত্য, চারুকলা ও কারুশিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। প্রশাসনিক দক্ষতা, সুবিচার এবং সংস্কৃতিপ্রেমের কারণে তিনি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন।

পারস্যের কবি হাফিজের সঙ্গে বন্ধুত্ব

গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের পরিচিতি শুধু বাংলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সময়েই বাংলার সঙ্গে পারস্যের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও গভীর হয়। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, পারস্যের বিশ্বখ্যাত কবি হাফিজ শিরাজির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। সুলতানের আমন্ত্রণের জবাবে হাফিজ একটি গজল রচনা করে তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলার এক শাসক ও পারস্যের শ্রেষ্ঠ কবির এই সাহিত্যিক সম্পর্ক তৎকালীন বাংলার আন্তর্জাতিক মর্যাদারও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

হত্যার পর সমাহিত শাহচিল্লাপুরে

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের বেশি সময় রাজত্ব করার পর ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হন গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ। ১৪১১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর শাহচিল্লাপুর গ্রামেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। এরপর কেটে গেছে ছয় শতাব্দীরও বেশি সময়। কিন্তু ইতিহাসের বহু ঝড়-ঝাপটা, শাসক পরিবর্তন ও সময়ের নির্মম ক্ষয়ও মুছে দিতে পারেনি তাঁর স্মৃতিচিহ্ন।

সংরক্ষণে আরও উদ্যোগের দাবি

প্রতিদিনই এখানে আসেন ইতিহাসপ্রেমী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটক। তবে স্থানীয়দের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রচার, সংরক্ষণ ও পর্যটনসুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তথ্যসমৃদ্ধ প্রদর্শনী, আধুনিক নির্দেশনাব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এই সমাধিকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।

ছয় শতাব্দী আগের এক স্বাধীন সুলতানের নিদর্শন হয়ে শাহচিল্লাপুরের এই সমাধি আজও নীরবে বলে যায় বাংলার গৌরবময় অতীতের গল্প। ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী যে কোনো মানুষের জন্য এটি কেবল একটি সমাধি নয়—বরং মধ্যযুগীয় বাংলার রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, শিল্প ও সভ্যতার এক জীবন্ত সাক্ষ্য।

MCH/AHA
আরও পড়ুন