সন্তান-স্বজনের অপেক্ষায় দিন কাটে মনিপুর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম

জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বয়সের ভারে যখন শরীর নুয়ে আসে, তখন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সঙ্গ, যত্ন ও ভালোবাসার। কিন্তু নানা বাস্তবতায় অনেক প্রবীণের জীবনের শেষ অধ্যায় কাটে একাকিত্ব ও অসহায়ত্বের মধ্যে। কেউ হারিয়েছেন জীবনসঙ্গী, কেউ সন্তান-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন, আবার কেউ নানা কারণে পরিবার থেকে দূরে। এমন প্রবীণদের অনেকের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছে গাজীপুর সদর উপজেলার মনিপুর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র।

সদর উপজেলার ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়নের বিশিয়া কুড়িবাড়ী, মনিপুর এলাকায় অবস্থিত এই পুনর্বাসন কেন্দ্রটি অসহায় প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি জীবনের শেষ সময়ে কিছুটা স্বস্তি ও আপনজনের অনুভূতি দেওয়ার চেষ্টা করছে। এখানে থাকা প্রবীণদের কারও জীবনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প, কারও জীবনে স্বজন হারানোর বেদনা, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতা।

কেন্দ্রটিতে প্রবীণদের আবাসনের পাশাপাশি খাবার, চিকিৎসা, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী তাদের দেখভাল করা হয়। একসঙ্গে থাকা প্রবীণরা গল্প-আড্ডা, প্রার্থনা ও পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করে সময় কাটান। এতে তাদের একাকিত্ব কিছুটা হলেও কমে আসে।

ময়মনসিংহ থেকে এই কেন্দ্রে আসা আব্দুল গফুর বলেন, জীবনের একটা সময় নিজের সংসার ছিল, আপন মানুষ ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একে একে দূরে চলে গেছে। এখানে এসে অন্তত থাকার একটি জায়গা পেয়েছেন। যারা দেখাশোনা করেন, তাদের কাছ থেকেও ভালো ব্যবহার পান। তবে নিজের মানুষদের কথা মনে পড়লে মন খারাপ হয়ে যায়।

৭৬ বছর বয়সী আলতাফ হোসেন বলেন, ছোটবেলায় বাবা-মা তাদের আগলে রেখেছেন। তিনিও সন্তানদের মানুষ করতে অনেক কষ্ট করেছেন। এখন বয়স হয়েছে, শরীর আগের মতো কাজ করে না। এই বয়সে টাকা-পয়সার চেয়ে মানুষের একটু ভালোবাসা ও কথা বলার সঙ্গই বেশি প্রয়োজন।

কেন্দ্রটির আরেক বাসিন্দা গোপালগঞ্জের আব্দুল হান্নান। কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে সংসার চালিয়েছেন তিনি। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের প্রয়োজনও অনেক সময় উপেক্ষা করেছেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে কর্মক্ষমতা কমে গেলে বদলে যায় জীবনের বাস্তবতা। একপর্যায়ে আশ্রয় নিতে হয় পুনর্বাসন কেন্দ্রে।

আব্দুল হান্নান বলেন, আগে সারাদিন কাজ করতেন। সংসারের মানুষদের জন্য ছুটে বেড়িয়েছেন। এখন কাজ করার শক্তি নেই। অনেক কিছুই বদলে গেছে। এখানে এসে নতুন কিছু মানুষকে পেয়েছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলেন, সময় কাটান। কিন্তু নিজের ঘর আর আপনজনের কথা কখনো ভোলা যায় না।

কেন্দ্রের এক পরিচালক জানান, এখানে বর্তমানে মোট ১৬০ জন প্রবীণ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৫ জন নারী। খাবার, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনির কাছ থেকে যে ভালোবাসা পাওয়া যায়, তা অন্য কেউ দিতে পারে না।

তিনি বলেন, প্রবীণদের মানসিক প্রশান্তি, সম্মান ও পারিবারিক সম্পর্কও তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারপরও তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, কথা বলা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার মাধ্যমে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কেন্দ্রের বাসিন্দারা জানান, এখানে এসে অন্তত নিরাপদে থাকার সুযোগ পেয়েছেন তারা। নিয়মিত খাবার, আবাসন ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ায় দৈনন্দিন জীবনের অনেক দুশ্চিন্তা কমেছে। তবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা কিংবা কথা বলার সুযোগ পেলে তাদের আনন্দের মাত্রা যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রটির বাসিন্দাদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ভিন্ন ধরনের আবেগ। কেউ ফিরে দেখছেন পুরোনো দিনের স্মৃতি, কেউ বলছেন সন্তানদের কথা, আবার কেউ জীবনের শেষ দিনগুলো শান্তিতে কাটানোর প্রত্যাশা করছেন।

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস শুধু প্রবীণদের নিয়ে আলোচনা করার একটি দিন নয়; এটি তাদের অবদান, অভিজ্ঞতা ও অধিকার স্মরণ করারও উপলক্ষ। আজ যারা প্রবীণ, তাদের অনেকেই একসময় পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য দীর্ঘদিন শ্রম দিয়েছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের প্রয়োজন নিরাপত্তা, সম্মান, সঙ্গ ও ভালোবাসা।

মনিপুর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রবীণদের জীবন তাই সমাজের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে—বয়স বাড়ার সঙ্গে একজন মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যান না। জীবনের শেষ অধ্যায়েও প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য মর্যাদা, যত্ন এবং আপনজনের মতো ভালোবাসা।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত