এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়ে প্রতারণার শিকার শত শত নারী

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৬ এএম

একদিকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার আশ্বাস, অন্যদিকে পরিচয় যাচাইয়ের কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ স্ক্যান। সরল বিশ্বাসে এসব তথ্য দেওয়ার কিছুদিন পরই দেশের দূরবর্তী জেলার প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের মামলায় নিজেদের নাম জড়িয়ে যাওয়ার খবর পাচ্ছেন ঝিনাইদহের শত শত নারী।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। দৈনিক ইত্তেফাক-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা বা সরকারি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি চক্র নারীদের কাছ থেকে এনআইডির তথ্য, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইরিশ স্ক্যান সংগ্রহ করেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পরে চট্টগ্রাম ও সাতক্ষীরায় দায়ের হওয়া পৃথক সাইবার ও আর্থিক অপরাধের মামলায় কয়েকজন নারীর নাম উঠে আসে।

ঘটনাটি শুধু প্রতারণার অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিকের সবচেয়ে সংবেদনশীল পরিচয়-তথ্য ব্যবহারের প্রশ্ন। কারণ, এনআইডি নম্বর বা মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করা গেলেও আঙুলের ছাপ কিংবা চোখের আইরিশের মতো বায়োমেট্রিক পরিচয় একজন মানুষের স্থায়ী শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যুক্ত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রামে একটি সংঘবদ্ধ চক্র স্বাস্থ্যসেবা বা সরকারি সহায়তা দেওয়ার কথা বলে নারীদের কাছে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য তথ্য নিবন্ধনের কথা বলে একটি ডিভাইসের মাধ্যমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইরিশ স্ক্যান নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সংগ্রহ করা হয় এনআইডির তথ্য বা অনুলিপি।

স্থানীয়দের দাবি, রামচন্দ্রপুরসহ কয়েকটি এলাকায় শত শত নারীর তথ্য এভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে অন্তত ৩০০ নারীর তথ্য নেওয়ার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা স্থানীয়দের দাবি; তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যেসব নারী নিজেদের তথ্য দিয়েছেন, তাদের কেউ কেউ পরে জানতে পারেন দেশের অন্য জেলার মামলায় তাদের নাম এসেছে। পুলিশের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ও সাতক্ষীরার পৃথক মামলার সূত্র ধরে ঝিনাইদহের কয়েকজন নারীর পরিচয়, এনআইডি এবং অতীত অপরাধের রেকর্ড যাচাই করতে স্থানীয় পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই—যে উদ্দেশ্যে একজন নাগরিক তার তথ্য দেন, সেই উদ্দেশ্যের বাইরে তথ্য ব্যবহার করা হলে দায় কার?

ভুক্তভোগী হিসেবে যাদের কথা প্রতিবেদনে এসেছে, তাদের দাবি, তারা কোনো আর্থিক প্রতারণা বা মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত নন। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার আশ্বাসে তথ্য দেওয়ার পর কীভাবে তাদের পরিচয় প্রতারণার মামলায় ব্যবহৃত হলো, সেটিই এখন তদন্তের বিষয়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: কোনো ব্যক্তির নামে কোনো মামলায় তথ্য পাওয়া যাওয়া মানেই ওই ব্যক্তি অপরাধে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কার তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, কে ব্যবহার করেছে এবং কোনো আর্থিক লেনদেন বা অ্যাকাউন্ট খোলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল—এসব তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।

ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি আসাদুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও সাতক্ষীরা থেকে পাঠানো অনুসন্ধান স্লিপের বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ বলা সম্ভব নয় বলেও তিনি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অপরিচিত ব্যক্তির কাছে এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ডিজিটাল যুগে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, মোবাইল সেবা এবং বিভিন্ন সরকারি ব্যবস্থায় পরিচয় নিশ্চিত করতে আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। ঢাকার আটটি বস্তি এলাকার ৪৫৮ জন সম্প্রতি সন্তান জন্ম দেওয়া নারীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা সহজ হলে ৭৮ শতাংশ নারী কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীকে ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে আগ্রহী ছিলেন। তবে প্রায় ১০ শতাংশ নারী তথ্যের অপব্যবহার বা অপব্যবহারের আশঙ্কাকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে অনিচ্ছার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবায় বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিজেই অপরাধ নয়। বরং মূল প্রশ্ন হলো—কারা তথ্য নিচ্ছে, কেন নিচ্ছে, কোথায় সংরক্ষণ করছে এবং সেই তথ্য পরে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বায়োমেট্রিক তথ্যের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর অপরিবর্তনীয় চরিত্র। পাসওয়ার্ড ফাঁস হলে পাসওয়ার্ড বদলানো যায়। মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু আঙুলের ছাপ বা আইরিশ তো বদলানো যায় না।

সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এনআইডি, আর্থিক তথ্য, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য এবং বায়োমেট্রিক তথ্যের অবৈধ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর একটি বিশ্লেষণে বায়োমেট্রিক ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যকে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ ধরনের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে সম্মতি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে প্রথম আলো-র সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে অর্থের বিনিময়ে এনআইডি, বায়োমেট্রিক তথ্য, মোবাইল আর্থিক সেবার তথ্য এবং এমনকি কল ডিটেইল রেকর্ড পাওয়ার অভিযোগের চিত্রও উঠে এসেছে। এতে ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে অপরাধী চক্রের হাতে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হতে পারে, সে বিষয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার ক্ষেত্রে পরিচয়-তথ্য এখন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কারও এনআইডি, মোবাইল নম্বর বা বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে তার নামে সিম, অ্যাকাউন্ট বা অন্যান্য সেবা খোলার সুযোগ তৈরি হলে প্রকৃত ব্যক্তিই পরবর্তীতে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।

ঝিনাইদহের ঘটনাতেও স্থানীয়দের আশঙ্কা, সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে অবৈধভাবে সিম নিবন্ধন বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি এখনো অভিযোগ ও আশঙ্কার পর্যায়ে রয়েছে; তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তদন্তকারীদের সামনে তাই শুধু ‘কে অপরাধী’—এই প্রশ্নই নয়; আরও কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ কে দিয়েছিল? কোন প্রতিষ্ঠানের নামে তথ্য নেওয়া হয়েছিল? ব্যবহৃত ডিভাইস কার? সংগৃহীত তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হয়েছে? কতজনের তথ্য নেওয়া হয়েছে? তথ্যগুলো অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি না? এবং ওই তথ্য ব্যবহার করে কোনো সিম, ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবা অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে কি না?

এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো, কথিত তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্য হিসেবে বিপুলসংখ্যক নারী সামনে আসার অভিযোগ।

স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা বা সরকারি সহায়তার মতো প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যুক্ত থাকলে সাধারণ মানুষ সহজেই তথ্য দিতে রাজি হতে পারেন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ যদি মনে করেন তথ্য দেওয়া সরকারি বা চিকিৎসাসেবার নিয়মের অংশ, তাহলে তথ্যের প্রকৃত ব্যবহার সম্পর্কে প্রশ্ন করার সুযোগ কমে যেতে পারে।

এখানেই তৈরি হয় আস্থার ঝুঁকি। স্বাস্থ্যসেবার নামে সংগৃহীত তথ্য যদি অন্য কাজে ব্যবহার হয়, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ভবিষ্যতে প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও মানুষের আস্থা কমতে পারে।

ঝিনাইদহের অভিযোগ তাই একটি নির্দিষ্ট প্রতারণা মামলার চেয়েও বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—নাগরিকের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে জবাবদিহি কোথায়?

কোনো স্বাস্থ্যকর্মী বা প্রতিষ্ঠান যদি তথ্য সংগ্রহ করে, তাহলে তার পরিচয় যাচাই করার সুযোগ থাকতে হবে। তথ্য কেন নেওয়া হচ্ছে, কোথায় ব্যবহার হবে, কতদিন রাখা হবে এবং কার সঙ্গে শেয়ার করা হবে—এসব বিষয় নাগরিককে স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি।

একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তের পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। কোনো নারীর তথ্য কোনো প্রতারণামূলক অ্যাকাউন্টে পাওয়া গেলেই তাকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার আগে তথ্য ব্যবহারের পুরো চেইন খুঁজে বের করা দরকার।

কারণ, একটি আঙুলের ছাপ বা আইরিশ স্ক্যান কেবল একটি সংখ্যা বা ফাইল নয়—এটি একজন মানুষের পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত তথ্য। সেই তথ্য যদি প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি মামলায় নাম জড়িয়ে পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; একজন নাগরিকের পরিচয়, আর্থিক নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ঝিনাইদহের নারীদের ক্ষেত্রে তদন্তের ফলই এখন নির্ধারণ করবে—এটি কেবল তথ্য সংগ্রহের একটি অনিয়ম ছিল, নাকি পরিকল্পিতভাবে বায়োমেট্রিক পরিচয় ব্যবহার করে বৃহত্তর প্রতারণার কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করেছে। সেই উত্তর পাওয়ার জন্য প্রয়োজন তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে কথিত প্রতারণার অর্থনৈতিক লেনদেন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার অনুসন্ধান।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন