আলাস্কার বরফ জমা ‘স্মিথ লেক’-এর প্রান্ত ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই পানির নিচ থেকে বুদবুদ বা গ্যাসে ভর্তি ফেনা ভেসে উঠতে দেখা যায়। এসব বুদবুদ মূলত বিষাক্ত মিথেন গ্যাস—যা হাজার বছর ধরে সেখানে জমে থাকা গাছপালা ও প্রাণীর পচে যাওয়া অবশিষ্টাংশ থেকে তৈরি। আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফ এত দ্রুত গলছে যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমা থাকা জমানো বরফ বা ‘পারমাফ্রস্ট’ আর আগের মতো শক্ত থাকছে না। স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় চারগুণ দ্রুত গতিতে এই অঞ্চলটি উত্তপ্ত হওয়ায় জমানো মিথেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস এখন ধীরে ধীরে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
নর্দান অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞানী টেড সুর এটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ভয়ংকর বা আশঙ্কাজনক মোড় বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, মাটিতে এত বিপুল পরিমাণে কার্বন জমা আছে যে একবার এই গ্যাস লিকেজ হওয়া শুরু হলে তা বন্ধ করা কঠিন। প্রতি বছরই এই বরফ গলার নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের তথ্য মতে, বর্তমানে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ কার্বন রয়েছে, তার চেয়ে তিনগুণ বেশি কার্বন জমানো অবস্থায় রয়ে গেছে এই পারমাফ্রস্টে। মানুষের জ্বালানি তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর গ্যাসের সাথে বরফ গলে বের হওয়া এই মিথেন যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
পারমাফ্রস্ট হলো মাটি, বরফ ও জৈব উপাদানের এমন একটি স্তর যা টানা দুই বছর বা তারও বেশি সময় ধরে জমে থাকে। আলাস্কা, কানাডা, সাইবেরিয়া ও অ্যান্টার্কটিকার মতো হিমশীতল অঞ্চলে হাজার বছর ধরে এই বরফ একটি প্রাকৃতিক ফিল্টার বা সুরক্ষাবর্ম হিসেবে কাজ করছিল। কিন্তু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এই জমানো বরফ এখন গলতে শুরু করেছে।
স্টকহোম ইউনিভার্সিটির পারমাফ্রস্ট গবেষক গুস্তাভ হুগেলিয়াসের মতে, পারমাফ্রস্ট ব্যবস্থাটি অনেকটা ‘ঘুমন্ত দৈত্যের’ মতো। হাজার বছর ধরে এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শুষে নিয়ে একটি ভারসাম্য বজায় রাখত। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়ায় এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বরফ শুষে নেওয়ার চেয়ে বেশি পরিমাণ ক্ষতিকর গ্যাস বাইরে ছেড়ে দিচ্ছে, যা জলবায়ু সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু উইভারের মতে, চলতি শতাব্দীর শেষের দিকে এই জমানো গ্যাস গলে বের হওয়ার কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা অতিরিক্ত ০.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ০.২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বেড়ে যেতে পারে। এটি যুক্ত হবে তেল ও কয়লা পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট উষ্ণতার ওপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পুরো ইউরোপ মহাদেশের সমান ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে এই অতিরিক্ত তাপমাত্রা।
অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে ভূখণ্ড
পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া কেবল বায়ুমণ্ডলে গ্যাস নিঃসরণ করছে না, বরং মাটিকে নরম ও অস্থিতিশীল করে ফেলছে। বরফ গলে যাওয়ায় যেসব অঞ্চলের ওপর ঘরবাড়ি, সড়ক ও পাইপলাইন তৈরি হয়েছিল, সেগুলো ধসে পড়ছে এবং গর্ত তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে উত্তর মেরু অঞ্চলে এমন ৪০ হাজারেরও বেশি মাটির ধস চিহ্নিত করেছেন।
সম্প্রতি নেপালে তাপপ্রবাহের কারণে হিমবাহ গলে মারাত্মক বন্যা ও ১ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির পেছনেও বরফ গলজনিত অস্থিতিশীল ভূখণ্ডকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। আলাস্কার ফেয়ারব্যাংকসে মার্কিন সেনাবাহিনীর তৈরি করা একটি পারমাফ্রস্ট গবেষণাগারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বরফের নিচে হাজার বছরের পুরোনো ম্যামথ ও বাইসনের কঙ্কাল জমে আছে, যা পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মিথেন তৈরি করছে।
উডওয়েল ক্লাইমেট রিসার্চ সেন্টারের গবেষক সু নাটালি বলেন, "এটি ১০০ বছর পরের কোনো সমস্যা নয়; এটি এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় জলবায়ু সংকট। বরফ গলার কারণে আমরা প্রতিদিন আমাদের পায়ের নিচের মাটি হারাচ্ছি।"
সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ইরানি নারীরা
মাঠে থুতু কাণ্ড: ইসরায়েল-আয়ারল্যান্ড ম্যাচে চরম উত্তেজনা