যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এআই খাতের শেয়ারে বড় ধসের কারণ কী?

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অভাবনীয় উত্থান কি থেমে যাচ্ছে, নাকি বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য ঝুঁকি বুঝতে শুরু করেছেন? যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের বড় দরপতনের পর এমন প্রশ্নই সামনে এসেছে। বিশেষ করে দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর এআই খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাকে। অ্যালফাবেট, এনভিডিয়া, মেটা ও অ্যাপলের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেও এর প্রভাব পড়ে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর এই দরপতন ঘটে। নির্বাচনী প্রচারে দলটির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ডেটা সেন্টারের লাগামহীন সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের পেছনে এসব ডেটা সেন্টারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানের কারণে এআই খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। তবে প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ নির্বাচনের আগ থেকেই বাড়ছিল।

এআইয়ের উত্থান ও বিনিয়োগের জোয়ার

২০২২ সালের শেষ দিকে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি প্রকাশের পর এআই প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আগ্রহ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি খাতে এক ধরনের বিনিয়োগের জোয়ার শুরু হয়।

কম্পিউটার চিপ ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো তৈরি, ডেটা সেন্টার নির্মাণ, সেগুলো চালানোর জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং এআই প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগকারীরা বিপুল অর্থ ঢালতে থাকেন। ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য দ্রুত বাড়তে থাকে।

চলতি বছরেও এই বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালেই এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ১ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই খাতে বিপুল অর্থ প্রবাহিত হওয়ায় অন্য শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়েছে।

তবে বিনিয়োগকারীরা এখন তাঁদের অর্থের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এআই খাতের বিপুল বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত মুনাফা এনে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একই সময়ে এআই গবেষকদের একাংশ প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ এমনও আশঙ্কা জানিয়েছেন, নিয়ন্ত্রণহীন এআই মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এসব বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পাওয়ায় ভবিষ্যতে এআই খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আসতে পারে—এমন ধারণাও জোরালো হয়েছে।

ডেটা সেন্টার নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের আপত্তি

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে জোরালো সমর্থন দিয়ে আসছে। ট্রাম্প নিজেই এআইকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বলে উল্লেখ করেন। তবে ডেমোক্র্যাট নেতারা ডেটা সেন্টার নির্মাণের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাবকে নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব দিয়েছেন।

ডেটা সেন্টারে বিপুল পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ ও পানির বিল বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি এসব স্থাপনার শব্দদূষণ, জমির ব্যবহার এবং স্থানীয় পরিবেশ ও জনজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি নিয়েও আপত্তি রয়েছে।

গত মে মাসে প্রকাশিত গ্যালাপের এক জরিপে দেখা যায়, ৭১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক নিজেদের এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করেন। একই জরিপে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করেন ৫৩ শতাংশ মানুষ।

একসময় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে সিনেট নির্বাচনে জয়ী হন ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো। ডেটা সেন্টার নিয়ে জনমতের এই সংশয়ের প্রতিফলন তাঁর প্রচারেও দেখা গেছে।

টালারিকো বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা পর্যন্ত এ প্রযুক্তির প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তাই নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্পষ্ট ও ধারাবাহিক আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা এখন প্রেসিডেন্টের প্রযুক্তিবিষয়ক নীতির আরও জোরালো বিরোধিতা করতে পারেন। পাশাপাশি এআই শিল্পের সম্প্রসারণ সীমিত করতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও নিতে পারেন।

টেক্সাসের গভর্নর নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসাও নির্বাচনী প্রচারে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করেন। নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক স্থগিতাদেশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।

হিনোজোসার জয় প্রযুক্তি খাতের ধনকুবের ইলন মাস্কের ব্যবসায়িক পরিকল্পনার জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। স্পেসএক্স ও টেসলার বড় অংশের কার্যক্রম তিনি টেক্সাসে সরিয়ে নিয়েছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার ব্যয় করেছিলেন টেসলার এই প্রধান নির্বাহী।

এআই শেয়ারের ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আর্ম হোল্ডিংসের সহপ্রতিষ্ঠাতা টিউডর ব্রাউনের মতে, শেয়ারের দাম নির্ধারিত হয় ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠান কতটা আয় করতে পারবে, তার ভিত্তিতে; শুধু বর্তমান আয়ের ওপর নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ মুনাফার সম্ভাবনা কমে গেলে বিনিয়োগকারীদের একাংশ শেয়ার বিক্রি করে দিতে পারেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় শেয়ারবাজারে যে দরপতন দেখা গেছে, তার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলকে দেখা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম বাস্তব মূল্যায়নের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গেছে—এমন উদ্বেগ নির্বাচনের আগ থেকেই ছিল।

এখন বড় প্রশ্ন হলো, সাম্প্রতিক দরপতন কি অতিরিক্ত আশাবাদী বিনিয়োগের কারণে শেয়ারদামে তৈরি হওয়া বাড়তি মূল্য কমিয়ে দিচ্ছে, নাকি এআই খাতের বিনিয়োগের জোয়ারে বড় ধরনের ধসের পূর্বাভাস দিচ্ছে? দ্বিতীয়টি সত্য হলে এর প্রভাব প্রযুক্তি খাতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ফিউচার মার্কেট ইনসাইটসের নন্দিনী রায় চৌধুরী মনে করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণ, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং এআই প্রযুক্তির প্রয়োগে কী ধরনের বিধিনিষেধ আসতে পারে, বিনিয়োগকারীরা এখন তা মূল্যায়ন করবেন।

তাঁর মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম। বরং বিনিয়োগকারীরা এখন আরও সতর্ক হয়ে আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী—এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে পারেন।

তবে টিউডর ব্রাউন মনে করেন, দরপতনের প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তাঁর মতে, এআইয়ের প্রবৃদ্ধি প্রায় সীমাহীন হবে—এমন প্রত্যাশায় অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল। পরে সেই অতিরিক্ত আশাবাদ থেকেই একধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

ব্রাউন বলেন, শেয়ারের দামের পতনের একটি স্বাভাবিক সীমা রয়েছে। সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর পর বিনিয়োগকারীরা আবারও বুঝতে পারবেন, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো এখনো উল্লেখযোগ্য মুনাফা করছে।

সূত্র: বিবিসি

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত