নারীদের হৃদরোগ শনাক্তে কাজ করছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চারটি সংস্থা 

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪০ এএম

নারীদের হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত ও চিকিৎসায় দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে হৃদ্‌রোগের সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাসে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চারটি হৃদ্‌রোগবিষয়ক সংস্থা যৌথভাবে নতুন এই সংজ্ঞা প্রকাশ করেছে, যা বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে দ্রুত ও সঠিক রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি, আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি , আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন যৌথভাবে তৈরি করেছে ‘ফিফথ ইউনিভার্সাল ডেফিনিশন অব মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন’। ২৮ আগস্ট প্রকাশিত এই নতুন সংজ্ঞা ২০১৮ সালের আগের শ্রেণিবিন্যাসকে প্রতিস্থাপন করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রচলিত হৃদ্‌রোগ নির্ণয় পদ্ধতিতে পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এমন হার্ট অ্যাটাকের ধরনকে দীর্ঘদিন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যায় এমন কিছু হৃদ্‌রোগ—যেমন ধমনির খিঁচুনি, করোনারি ধমনির স্বতঃস্ফূর্ত ছিঁড়ে যাওয়া এবং করোনারি এম্বোলিজম—অনেক সময় যথাযথভাবে শনাক্ত বা গুরুত্ব পায়নি। এর ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব এবং ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

নতুন সংজ্ঞায় হৃদ্‌পেশির ক্ষতি শনাক্ত করতে কার্ডিয়াক ট্রোপোনিনের নারী-পুরুষভেদে আলাদা সীমা ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কারণ নারীদের স্বাভাবিক ট্রোপোনিনের মাত্রা সাধারণত কম হওয়ায় একই সীমা ব্যবহার করলে কিছু ক্ষেত্রে তাদের হৃদ্‌রোগ শনাক্ত না হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নতুন ব্যবস্থায় আগের সংখ্যাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের পরিবর্তে হার্ট অ্যাটাককে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—প্রাইমারি, সেকেন্ডারি এবং প্রক্রিয়াজনিত (procedure-related) মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন।

প্রাইমারি হার্ট অ্যাটাক বলতে সরাসরি হৃদ্‌ধমনির কোনো তীব্র সমস্যার কারণে হওয়া হার্ট অ্যাটাককে বোঝানো হয়েছে। সেকেন্ডারি হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে অন্য কোনো তীব্র শারীরিক সমস্যার কারণে হৃদ্‌পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়। আর হৃদ্‌যন্ত্রের কোনো অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসা-পদ্ধতির জটিলতা থেকে তৈরি হার্ট অ্যাটাককে তৃতীয় শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া হৃদ্‌পেশির তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মানদণ্ড আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। নীরব বা অচিহ্নিত হার্ট অ্যাটাক শনাক্তের ক্ষেত্রেও নতুন নির্দিষ্ট মানদণ্ড যুক্ত হয়েছে। দ্রুত রোগ নির্ণয়ের জন্য উচ্চ-সংবেদনশীল ট্রোপোনিন পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুততর ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।

নতুন সংজ্ঞার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শুধু হার্ট অ্যাটাক হয়েছে কি না, সেটি নির্ধারণ করাই লক্ষ্য নয়; কেন হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, সেটিও শনাক্ত করা। এ কারণে হৃদ্‌যন্ত্রের ইমেজিং ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রোগের প্রকৃত কারণ জানা গেলে রোগীর জন্য আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন বাস্তবে কার্যকর হলে নারীদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক শনাক্তে দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্য কমতে পারে। বিশেষ করে যেসব নারীর হৃদ্‌ধমনিতে প্রচলিত অর্থে বড় ধরনের ব্লকেজ নেই, কিন্তু অন্য কারণে হৃদ্‌পেশির ক্ষতি হয়েছে, তাদের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা আরও সুনির্দিষ্ট হতে পারে।

নতুন সংজ্ঞায় MINOCA-র ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে এটিকে একটি নির্দিষ্ট রোগনির্ণয় হিসেবে দেখা হলেও এখন এটিকে চূড়ান্ত রোগনির্ণয়ের বদলে একটি ‘ওয়ার্কিং ডায়াগনসিস’ হিসেবে বিবেচনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ধমনিতে বড় ধরনের বাধা না থাকলেও হৃদ্‌পেশির ক্ষতির প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

হৃদ্‌রোগকে দীর্ঘদিন অনেকটাই ‘পুরুষের রোগ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। এর প্রভাব পড়েছে গবেষণা, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায়। নতুন সংজ্ঞার অন্যতম লক্ষ্যই হলো এই পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নারী-পুরুষের শারীরবৃত্তীয় পার্থক্যকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সিদ্ধান্তে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদ্‌রোগের উপসর্গ ও কারণ সব রোগীর ক্ষেত্রে একই রকম নয়। তাই রোগীর লিঙ্গ, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং হৃদ্‌পেশির ক্ষতির সম্ভাব্য কারণ বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন এই বৈশ্বিক সংজ্ঞা সেই দিকেই একটি বড় পদক্ষেপ। তবে এর সুফল পেতে হাসপাতাল, চিকিৎসক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন মানদণ্ড বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে।

এমএজেড
আরও পড়ুন