যখন মানুষ কোনো রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থার কাছে ন্যায়বিচার পায়নি তখন সে আশ্রয় নিয়েছে ভাষা ও কল্পনার সাহিত্যের। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সাহিত্য হয়ে ওঠে অস্তিত্বের ভাষা। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
‘ইউ রাইট ইন অর্ডার টু চেইঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড। দুনিয়াটা বদলে দিতে তোমাকে লিখতে হবে।’ জেমস বাল্ডউইন সাহিত্য এখানে কেবল শিল্পচর্চা নয়; এটি স্বর ছিনিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ, যেখানে একটি জাতি বা গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা, আশা ও সম্ভাবনা রূপ পায় শব্দের মধ্য দিয়ে। কথাসাহিত্য, কবিতা, আত্মজীবনী, বক্তৃতা কিংবা প্রবন্ধ সবই হয়ে উঠতে পারে এমন এক মাধ্যম, যার ভেতর দিয়ে চেপে রাখা ইতিহাস ও নিষ্পেষিত কণ্ঠস্বর উঠে আসে প্রকাশের জোরালো পরিসরে।
কীভাবে সাহিত্য এক শক্তিশালী প্রতিরোধের মাধ্যম হয়ে উঠেছে; কীভাবে লেখকের কলম হয়ে উঠেছে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে অস্ত্র, তার আভাস আপনারা এই লেখায় পাবেন। ফ্রেডেরিক ডাগলাস থেকে আমান্ডা গরম্যান, টোনি মরিসন থেকে অড্রে লর্ড, চিনুয়া আচেবে থেকে ক্লডিয়া র্যাঙ্কিন পর্যন্ত তাদের রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে সাহস, স্বর ও সংগ্রাম। এই লেখকরা কেবল নিপীড়নের কথাই বলেননি; তারা একটি ভিন্ন ভাষা নির্মাণ করেছেন যে ভাষা ভাঙন নয়, বরং নির্মাণের; যে ভাষা পরাজয়ের নয়, বরং টিকে থাকার, লড়ার ও আশাবাদের।
দাসপ্রথার শিকড় কেটে কলমের জন্ম
আধুনিক প্রতিরোধমূলক সাহিত্যের শুরুর দিকে দাঁড়িয়ে আছেন ফ্রেডেরিক ডাগলাস। একজন প্রাক্তন দাস হিসেবে তার আত্মজীবনী ‘ন্যারেটিভ অব দ্য লাইফ অব ফ্রেডেরিক ডাগলাস’ (ফ্রেডেরিক ডাগলাসের জীবনের বিবরণ) ছিল দাসপ্রথার বিরুদ্ধে এক অনমনীয় কণ্ঠস্বর। এই গ্রন্থটি কেবল ডাগলাস-এর ব্যক্তিগত মুক্তির আখ্যান নয়, বরং আমেরিকার রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা ও সাংবিধানিক ভণ্ডামির প্রতিচ্ছবি। একই ধারায়, সোজার্নার ট্রুথ-এর ‘এইন্ট আই এ ওম্যান?’ (আমি কি একজন নারী নই?) বক্তৃতা বর্ণবাদ এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে একত্রে চ্যালেঞ্জ করেছে। হ্যারিয়েট জ্যাকবসের ‘ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব এ স্লেভ গার্ল’ (এক দাসী মেয়ের জীবনের ঘটনাবলি) আবার বিশ্লেষণ করেছে নারী দাসদের জীবনের আলাদা অভিজ্ঞতা, যা সাহিত্যে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিল।
শিল্পে আত্মপরিচয়ের খোঁজ
১৯২০-এর দশকের হার্লেম রেনেসাঁ ছিল কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সাংস্কৃতিক আত্ম-উন্মোচনের সময়। ল্যাংস্টন হিউজ তার কবিতায় জাতিগত গৌরব এবং সংগ্রামের অভিজ্ঞতা বুনে এনেছেন, যেমন ‘আই, টু, অ্যাম আমেরিকা’ (আমিও আমেরিকারই অংশ)। জোরা নীল হার্স্টন তার উপন্যাস ‘দেয়ার আইজ ওয়্যার ওয়াচিং গড’ (তাদের চোখ ঈশ্বরের দিকে)-এ কালো নারীদের ভেতরের জীবন ও ভাষাকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। কাউন্টি কুলেন-এর কবিতায় উচ্চ স্তরের কাব্যিকতা ও ধর্ম, প্রেম, বর্ণপ্রথা নিয়ে তীক্ষè বিশ্লেষণ পাওয়া যায়।
জেমস বাল্ডউইন-এর সাহিত্য জগৎ ছিল স্ববিরোধ ও আত্মসমীক্ষার ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক চেতনার উন্মোচন। তার ‘নোটস অব এ নেটিভ সন’ (এক স্বজাত সন্তানের নোটস) ও ‘দ্য ফায়ার নেক্সট টাইম’ (পরবর্তীবার আগুন আসবে) গ্রন্থে ব্যক্তিজীবনের বেদনা, জাতিগত নিপীড়ন এবং যৌন পরিচয়ের জটিলতা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। ‘জিওভানিস রুম’ (জিওভানির কক্ষ)-এ তিনি সাহসিকতার সঙ্গে সমকামিতা ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। বাল্ডউইন নিজেই বলেছিলেন, ‘টু বি এ নিগ্রো ইন দিস কান্ট্রি অ্যান্ড টু বি রেলেটিভলি কনশাস ইজ টু বি ইন এ রেইজ অলমোস্ট অল দ্য টাইম।’ (এ দেশে একজন কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে তুলনামূলক সচেতন থাকা মানে সবসময়ই ক্রোধে থাকা।)
সাহিত্যে ইতিহাসের পুনর্লিখন : টোনি মরিসন বলেছিলেন, “ইফ দেয়ার’স এ বুক দ্যাট ইউ ওয়ান্ট টু রিড, বাট ইট হ্যাজন’ট বিন রিটেন ইয়েট, দেন ইউ মাস্ট রাইট ইট।” (যদি এমন কোনো বই থাকে যা তুমি পড়তে চাও কিন্তু এখনো লেখা হয়নি, তবে তোমাকেই সেটি লিখতে হবে।) তিনি তার সাহিত্যকর্মে এমন ইতিহাসকে সামনে এনেছেন, যেগুলো দীর্ঘদিন বিস্মৃত ছিল। ‘বেলাভড’ (প্রিয়তমা) উপন্যাসে দাসত্বের ট্রমা ও মনস্তত্ত্বের গভীরে পৌঁছেছেন তিনি। ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’ (সবচেয়ে নীল চোখ)-তে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের আত্মঘৃণা ও শে^তাঙ্গ সৌন্দর্যবোধের অভিশাপ বিশ্লেষণ করেছেন। মরিসন ইতিহাসকে পুনর্লিখনের মধ্য দিয়ে একটি জাতীয় স্মৃতি নির্মাণের প্রয়াস চালিয়েছেন।
ভাষা যখন নারীর প্রতিরোধ
অড্রে লর্ড ছিলেন একাধারে কবি, নারীবাদী এবং সমাজ বিশ্লেষক। তার ‘সিস্টার আউটসাইডার’ (বহির্বর্তী বোন) প্রবন্ধ গ্রন্থে তিনি ভাষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। লর্ড-এর মতে, ‘পোয়েট্রি ইজ নট এ লাক্সারি। ইট ইজ এ ভাইটাল নেসেসিটি অব আওয়ার এক্সিস্টেন্স।’ (কবিতা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি আমাদের অস্তিত্বের এক অপরিহার্য প্রয়োজন।) তিনি বিশ্বাস করতেন, পার্থক্য মানেই বিভাজন নয় বরং এটি এক প্রকার শক্তি, যদি তা যথাযথভাবে চর্চিত হয়।
মায়া অ্যাঞ্জেলু থেকে অ্যালিস ওয়াকার : মায়া অ্যাঞ্জেলু তার আত্মজীবনী ‘আই নো হোয়াই দ্য কেজড বার্ড সিংস’ (আমি জানি খাঁচাবন্দি পাখি কেন গান গায়)-এ যৌন সহিংসতা, বর্ণবাদ ও নারীত্বের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। অ্যালিস ওয়াকার-এর ‘দ্য কালার পার্পল’ (বেগুনি রঙ) এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্প যেখানে চিঠির মাধ্যমে ব্যক্তিগত গল্প রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। ওয়াকার নারীবাদী চিন্তার বিকল্প পরিভাষা ওম্যানিস্ট ধারণার প্রবক্তা, যা কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের বাস্তবতা গভীরভাবে অনুধাবন করতে সাহায্য করে।
আফ্রিকান সাহিত্য : চিনুয়া আচেবে-এর ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ (সবকিছু ভেঙে পড়ে) উপন্যাস পশ্চিমা ঔপনিবেশিক সাহিত্যের পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভেঙে দেয়। এনগুগি ওয়া থিয়োংও বলেন, ভাষা হলো উপনিবেশবাদের প্রধান হাতিয়ার। তিনি ইংরেজি লেখালেখি পরিত্যাগ করে নিজের মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। ওয়ারসান শায়ার-এর কবিতায় উদ্বাস্তু জীবন, লিঙ্গগত সহিংসতা এবং নির্বাসনের কষ্ট ফুটে ওঠে। তার ‘হোম’ (ঘর) কবিতাটি বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তু সংকট নিয়ে নতুন ভাবনার দিক খুলে দেয়।
সমসাময়িক কণ্ঠস্বর
ক্লডিয়া র্যাঙ্কিনের ‘সিটিজেন : এন আমেরিকান লিরিক’ (নাগরিক : এক আমেরিকান গীতি)-এ কবিতা, প্রবন্ধ এবং ভিজ্যুয়াল ইমেজের সংমিশ্রণে একটি আধুনিক সাহিত্যের রূপ নির্মিত হয়েছে। তা-নেহেসি কোটস-এর ‘বিটুইন দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড মি’ (পৃথিবী ও আমার মধ্যবর্তী) একটি পিতার ছেলেকে লেখা চিঠির আঙ্গিকে জাতিগত সন্ত্রাস এবং আত্মপরিচয়ের চিত্র আঁকে। আমান্ডা গরম্যান তার ‘দ্য হিল উই ক্লাইম্ব’ (আমরা যে পাহাড়ে উঠি) কবিতায় তরুণদের জন্য আশাবাদের বার্তা তুলে ধরেন একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন, যেটি সাহিত্যের মাধ্যমে সম্ভব।
এখানে অল্প কথায় আরও কিছু উল্লেখযোগ্য কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যিক সম্পর্কে জেনে নেওয়া যেতে পারে।
আমোস তুতুওয়ালা : নাইজেরিয়ান লেখক তুতুওয়ালা তার ‘তাড়িখোর’ উপন্যাসে লোককথা, যাদুবাস্তবতা ও কল্পনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে আফ্রিকান সাহিত্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। ঔপনিবেশিক কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে, তিনি ইউরুবা সংস্কৃতি ও ভাষার ভেতর থেকে এক বিকল্প সাহিত্যের ধারা সৃষ্টি করেন, যা ভাষাগত ও ভাবগতভাবে প্রতিরোধের এক উদাহরণ।
চিমান্ডা এনগোজি আদিচি : আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের অন্যতম মুখ আদিচি, যার ‘আধেকটা হলুদ সূর্য’, ‘আমেরিকানাহ’, এবং ‘আমাদের সকলেরই নারীবাদী হওয়া উচিত’ নারী অধিকার, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও অভিবাসী অভিজ্ঞতার গল্প বলে। তার লেখায় রয়েছে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান এবং একটি সাহসী কণ্ঠস্বর, যা আফ্রিকার নারীদের দীর্ঘদিনের চুপ থাকা ইতিহাসকে ভেঙে দেয়।
পল ডানবার : ১৯ শতকের এই কবি ও ঔপন্যাসিক ছিলেন প্রথম আফ্রো-আমেরিকানদের মধ্যে একজন যিনি জাতীয় স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তার কবিতায় উঠে এসেছে দাসত্বোত্তর জীবনের নিপীড়ন ও আত্মমর্যাদার লড়াই।
গিল স্কট হেরন : যাকে অনেকে ‘গডফাদার অব র্যাপ’ বলেন, তার কবিতা ও সংগীত ছিল আফ্রো-আমেরিকান অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রীয় অবহেলার বিরুদ্ধে এক ধারালো অস্ত্র। বিপ্লব টিভিতে দেখানো হবে না বা ‘The Revolution Will Not Be Televised’ একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আইকন হয়ে উঠেছে।
নাতাশা ট্রেথিউয়ে : এই পুলিৎজার বিজয়ী কবি আমেরিকার দাসত্বের ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রশ্ন নিয়ে কাজ করেছেন। তার কবিতায় ঐতিহাসিক তথ্য ও আবেগ মিশে যায় অনন্য এক কাব্যিক ভাষায়।
রক্সানে গে : তার ‘Bad Feminist’ প্রবন্ধ গ্রন্থ সমসাময়িক নারীবাদ ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অভিজ্ঞতা নিয়ে এক সাহসী স্বর। তিনি মূলধারার সংস্কৃতিকে প্রশ্ন করেন এবং আত্মপরিচয়ের বৈচিত্র্য উদযাপন করেন।
সাহিত্য ও অনুবাদের রাজনীতি : এই লেখাগুলোর বেশিরভাগ বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়নি। এতে একটি বড় শ্রেণি এসব প্রতিরোধমূলক সাহিত্যের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়। অনুবাদের মধ্য দিয়ে সাহিত্যের এই প্রতিরোধ-স্বর আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠে আমাদের পাঠ্যক্রমে কোন লেখকদের জায়গা দেওয়া হয়, আর কাদের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়? আমাদের নিজেদের সাহিত্যেও কি এমন প্রতিরোধমূলক চর্চা নেই? বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ এক ইউটোপিয়ান সমাজকল্পনা, যেখানে নারী নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সমাজ কল্পনা করা হয়েছে।
সাহিত্যের প্রতিরোধ চলমান ভাষ্য
সাহিত্যিক একটিভিজম কেবল একটি আন্দোলন নয়, এটি ইতিহাসের বিকল্প পাঠ, একটি গভীর আত্মবিশ্বাসের স্বর। জেমস বাল্ডউইন থেকে আমান্ডা গরম্যান পর্যন্ত এই ধারার সাহিত্যিকরা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন কলম অনেক সময় তলোয়ারের চেয়েও ধারালো। প্রতিরোধের এই কণ্ঠগুলো শুধুই শোষণের দলিল নয়, বরং তারা ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও ধারণ করে। এখন প্রশ্ন হলো আমরা কি সেই কণ্ঠস্বর শুনছি? আমরা কি আমাদের সাহিত্যে এই প্রতিরোধকে চর্চা করছি?
সাহিত্য প্রতিদিন লিখে চলেছে নতুন এক ইতিহাস যা হয়তো মূলধারায় জায়গা পায় না, কিন্তু প্রান্তে জন্ম নেয় এমন এক ভাষা, যেটি হৃদয়ের গভীরতম স্তর থেকে উঠে আসে। সেই ভাষা, যা প্রতিরোধের, পুনর্জন্মের এবং সবচেয়ে বড় কথা পরিবর্তনের।
সূত্র: দেশ রুপান্তর
