পর্ব-৮
হাসতে গিয়ে মুখের খাবার বেরিয়ে পড়ছে। এসব কাণ্ড দেখে বেবিও হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সত্য নারায়ণ বাগানের আগাছা পরিষ্কার করতে করতে চিন্তা করছে, কোথায় যাবে সে! সত্যিই কি চলে যেতে হবে তাদের! এমন সময়ে ফুলকাকু বাইরের দরজা দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। সত্য নারায়ণ হঠাৎ ফুলকাকুকে দেখে হকচকিয়ে গেলো। হাত থেকে মাটি পরিষ্কার করে দৌড়ে যাদবানন্দের কাছে গেলো। যাদবানন্দ ততক্ষণে তার ঘরে গিয়ে বসেছে।
‘সত্য! কিছু ব্যবস্থা কি হলো! এবার বাড়িটা যে ছাড়তেই হয়।’ ফুলকাকুর মুখের কথা শুনে অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো সত্য নারায়ণ। তার তাকিয়ে থাকার মধ্যে নিরব প্রশ্ন বুঝতে পারলো যাদবানন্দ। নিরবতা ভেঙে নিজেই বলে উঠলো, ‘শোন, তোমার বাবা তোমাকে তার বাড়িতে জায়গা দেয়নি, আমি দিয়েছিলাম। কিন্তু আবারো একটা মেয়ে! আমারো তাই বিশ্বাস এখন, তোমাদের সত্যি অশুভ যোগ আছে। এখানে যদি তোমরা থাকো তাহলে এ বাড়িতেও অশুভ যোগ লাগবে। পরবর্তীতে এ বাড়ির কারোই ছেলে সন্তান হবে না। তোমরা অন্য বাড়ি দেখো বাপু। তাড়াতাড়ি আমার বাড়ি ফাঁকা করো।’
সত্য নারায়ণ কোনো কথা বলতে পারছে না। পা দুটো চোরাবালিতে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে। বুঝতে পেরেও তার কিছুই করার নেই। অসহায় দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন চোরাবালিতে নিজেকে পুরোপুরি সপে দেবার অপেক্ষায়। কতক্ষণ যে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে সত্য নারায়ণ, জানে না সে। দুঃস্বপ্নের মতন লাগছে সবটা। সোনালী, কাবেরী স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে না ডাকতে আসলে সত্য নারায়ণের স্বাভাবিক হতে হয়তো আরো অনেক সময় লাগতো। মেয়েদের দেখতে পেয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলো ওদের। অঝোরে কাঁদতে শুরু করলো। তার মতন অসহায় পিতা বোধহয় পৃথিবীতে আর একটাও নেই।
আঘাত মানুষকে শক্ত করে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য প্রস্তুত করে। সত্য নারায়ণও যেন হঠাৎ করে সব দুঃখ ঝরিয়ে নির্ভার হয়েছে। যত ঝড় আসে আসুক, বিধাতা এই ভাগ্যে যা লিখেছেন তা হবেই। এত দুশ্চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। নিজেকে এভাবেই বুঝিয়েছে সত্য নারায়ণ।
যাদবানন্দ তথা ফুলকাকু বাড়ি ছাড়ার কথা বলার পর তিনমাস পেরিয়ে গেছে। এতটুকু ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে পারবে না সত্য নারায়ণ, জানিয়ে দিয়েছে ফুলকাকুকে। তিনিও বিরক্ত হয়ে বাড়ি খোঁজার সময় দিয়েছে সত্য নারায়ণকে। আভা বা সত্য নারায়ণ আর বিচলিত হবে না, কারণ ওরা জানে ওদের জীবনে একটার পর একটা ঝড় আসতেই থাকবে। ওরা প্রস্তুত আজ সব বিপদের জন্য। রুম্পা হবার ৪ মাসের মধ্যে আভা আবার অন্তঃসত্ত্বা হলো। আভা বা সত্য নারায়ণ কারোরই পরিকল্পনা ছিল না বাচ্চা নেওয়ার। কিন্তু কীভাবে কি হলো দুজনের কেউ ই বুঝতে পারছে না। আভার শরীর দিনদিন আরো ভেঙে পড়তে শুরু করছে। ফুলকাকু একের পর এক বাড়ি ছাড়ার চাপ দিতে লাগলেন। সত্য নারায়ণ তার ছোট্ট মেয়ে রুম্পা আর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আভার কথা ভেবে ফুলকাকুর কাছে আরো কিছুদিন সময় ভিক্ষা চাইলো।
‘সেই তো আবারো আরেকটা মেয়ে জন্ম দেবে তোর বউ।’ মুখ বাঁকিয়ে এ কথা বলার সময়ে ফুলকাকুকে একটুও অদ্ভুত লাগলো না সত্য নারায়ণের। মনে হলো, এর থেকেও কঠিন কিছু শোনার জন্য সে নিজেকে তৈরি করে রেখেছে। তবে সত্য নারায়ণ প্রায় প্রতিদিনই বাইরে যায় কাজের খোঁজে। এর ফাঁকে ফাঁকে সত্য নারায়ণ বাড়ির খোঁজ করে। কিন্তু ভালো কোনো কাজ না করলে বাড়ি ভাড়া করবে কোন ভরসায়! যে কোনো সময়ে এ বাড়িতে যে সংসার সাজিয়ে বসেছিলো তা ভেঙে দিয়ে চলে যেতে হবে এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই।
শরীর যত খারাপ ই হোক, আভা তার মেয়েদের যত্ন নেবার চেষ্টা করে। তবে পারে আর কতটুকু! ফুলকাকু কিছু টাকা দিতেন মাস শেষে। কিন্তু কয়েকমাস হলো সেটাও বন্ধ করে দিয়েছেন ফুলকাকু। কেন টাকা দেওয়া বন্ধ করেছে তা বোঝে আভা। বোঝে সত্য নারায়ণও। তাইতো ফুলকাকুকে এ বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন করেনি সত্য নারায়ণ। এক হিসেবে এখানে জোর করেই এখন আছে ওরা। ফুলকাকু তো সেই কবেই বাড়ি ছাড়ার কথা বলে গেছে। শুধু বলে যায়নি এক প্রকারের শাসিয়ে গেছে। এরপর আর পয়সা দেবার প্রশ্নই আসে না। হঠাৎ করে যেন জীবনে অমাবস্যা নেমে এসেছে। সত্য নারায়ণ বাইরে ঘুরে বেড়ায়। মুটের কাজ, দিনমজুর, কুলির কাজ যখন যা পায় তাই করে চাল, ডাল, নুন নিয়ে ঘরে ফেরে। বাগানের সবজিটা যে এখনো কেড়ে নেয়নি ফুলকাকু সেজন্য মনে মনে ধন্যবাদ জানাতে ভোলে না সত্য নারায়ণ। জমির সবজি বা জমিতে চাষ করার অধিকার কেড়ে নেয়নি ফুলকাকু এজন্য ওরা কৃতজ্ঞ তার কাছে।
