রমজানে শয়তান বন্দি, তবু গোনাহ কেন?

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এ মাস শুরু হলে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় (বোখারি : ১৮৯৯)। তবু বাস্তবতা হলো, রমজানেও মানুষ গোনাহ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারে না। প্রশ্ন জাগে, শয়তান বন্দি থাকলে প্ররোচনা আসে কোথা থেকে?

উত্তর খুঁজতে হলে মানুষের অন্তর্জগৎকে বুঝতে হবে। মানুষের ভেতরে আছে নফস, প্রবৃত্তি, যা ভালো ও মন্দের মাঝখানে দোল খায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই নফস মানুষকে মন্দের দিকেই আহ্বান করে, তবে সে নয় যার প্রতি আমার রব দয়া করেন।’ (সুরা ইউসুফ : ৫৩)

আবার সুরা কিয়ামাহ (২)-এ নফসে লাওয়ামার শপথ করা হয়েছে, আর সুরা ফজর (২৭)-এ নফসে মুতমাইন্নাহর প্রশান্ত অবস্থার কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ মন্দের বীজ মানুষের ভেতরেই রোপিত। শয়তান সেই বীজে পানি দেয়, কিন্তু বীজটি আমাদেরই।

অনেক আলেমের ব্যাখ্যায় এসেছে, রমজানে সব শয়তান নয়; বরং প্রধান শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। ফলে কুমন্ত্রণা কমে, কিন্তু মানুষের বহু বছরের গড়ে ওঠা অভ্যাস, আসক্তি ও পরিবেশগত প্রভাব থেকে যায়। এক মাসের জন্য বাইরের প্ররোচনা সীমিত হলেও ভেতরের দুর্বলতা রাতারাতি বদলে যায় না।

যে চোখ দীর্ঘদিন অবাধ্য ছিল, যে জিহ্বা গিবত বা কটু কথায় অভ্যস্ত, সে কি একটি ঘোষণায় থেমে যাবে? পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সচেতন সাধনা, আত্মসংযমের অনুশীলন।

ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীল সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে সৎকর্ম করে সে নিজের জন্যই করে, আর যে অসৎকর্ম করে তা তারই বিরুদ্ধে যায়।’ (সুরা জাসিয়া : ১৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কাজ করে (তিরমিজি )।’ এই শিক্ষাই স্পষ্ট করে, আসল জিহাদ বাইরের কারও বিরুদ্ধে নয়; নিজের নফসের বিরুদ্ধে।

রমজান মূলত এক মাসের আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ। কোরআনে ঘোষণা এসেছে, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)

রোজা শুধু ক্ষুধা ও পিপাসা সহ্য করার নাম নয়। রাসুল (সা.) সতর্ক করেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (সহিহ বোখারি)

অতএব রমজান আমাদের শেখায়, আত্মনিয়ন্ত্রণই মুক্তির পথ। এখানে শয়তানের প্রভাব কমিয়ে আমাদের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেন আমরা নিজের ভেতরটাকে চিনতে পারি।

তাই রমজানে গোনাহ হলে শুধু শয়তানকে দোষ দিয়ে দায় সারা যাবে না। নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের অভ্যাস, নিজের দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। এ মাস অজুহাতের নয়; আত্মসমালোচনার। ব্যর্থতার নয়; ফিরে আসার।

আসুন, আমরা শয়তানকে নয়, নিজের নফসকে প্রশ্ন করি। প্রতিদিন একটু করে বদলাই। তাহলেই রমজান আমাদের জীবনে কেবল একটি মাস হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠবে আত্মশুদ্ধির নতুন সূচনার দরজা।

SN
আরও পড়ুন