টকশোতে ‘ভালো আলোচনা’র চেয়ে একটি ‘ভালো ঝগড়া’ বেশি লাভজনক! 

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ এএম

রাতের জনপ্রিয় একটি টেলিভিশন টকশো। আলোচনার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-রাজনীতি, অর্থনীতি, নির্বাচন কিংবা দেশের কোনো সংকট। শুরুতে সবাই শান্ত। সঞ্চালক প্রশ্ন করছেন, অতিথিরা নিজেদের মতামত দিচ্ছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি বদলে যায়। একজন আরেকজনের কথার মাঝখানে বাধা দিচ্ছেন। কণ্ঠস্বর উঁচু হচ্ছে। তর্ক থেকে বিতর্ক, বিতর্ক থেকে ব্যক্তিগত আক্রমণ। একপর্যায়ে গালাগালি, চেয়ার ছেড়ে চলে যাওয়া, কখনো হাতাহাতির উপক্রম।

আর দর্শক?

অনেকেই তখন টেলিভিশনের সামনে বসে থাকেন না। মোবাইল হাতে নিয়ে খুঁজতে থাকেন, ‘টকশোতে মারামারি’, ‘কে কী বললেন’, ‘অমুকের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া’। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই কয়েক মিনিটের উত্তপ্ত অংশ। তৈরি হয় অসংখ্য ক্লিপ, শর্টস, রিলস ও পোস্ট।

প্রশ্ন হলো—এসব ঘটনা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন অনুষ্ঠান থামানো হয় না কেন?

লাইভ মানেই কি সবকিছু দেখাতে হবে?

লাইভ অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তাৎক্ষণিকতা। দর্শক মনে করেন, তিনি ঘটনাটি ঘটার মুহূর্তেই দেখছেন। কিন্তু এই শক্তিই কখনো দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।

একজন অতিথি যখন অন্য অতিথিকে অপমান করছেন, গালাগালি করছেন বা শারীরিক সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করছেন, তখন সঞ্চালকের দায়িত্ব শুধু ‘চলতে দেওয়া’ নয়; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাও। প্রয়োজন হলে মাইক্রোফোন বন্ধ করা, ক্যামেরা অন্যদিকে নেওয়া কিংবা সম্প্রচার সাময়িকভাবে থামানো—এসব নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের প্রশ্ন উঠতেই পারে।

কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, উত্তেজনা যত বাড়ে, অনুষ্ঠান তত বেশি দর্শক টানে।

কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নাটকীয়তা, সংঘাত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা দেখতে আগ্রহী। একটি শান্ত আলোচনা হয়তো মানুষকে কয়েক মিনিট আটকে রাখে; কিন্তু ‘দুজন অতিথির তুমুল ঝগড়া’ মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে যেতে পারে।

ভিউয়ের অর্থনীতি

ডিজিটাল যুগে দর্শকসংখ্যা শুধু জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি অর্থনৈতিক মূল্যও তৈরি করে।

ইউটিউব নিজেই জানায়, দর্শক কোনো ভিডিওতে ক্লিক করেন কি না, কতক্ষণ দেখেন এবং কী ধরনের ইতিবাচক ইন্টারঅ্যাকশন করেন—এসব বিষয় কনটেন্টের পারফরম্যান্স ও সুপারিশ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ কোনো টকশোর উত্তপ্ত মুহূর্ত যদি মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও দেখতে বাধ্য করে, বারবার দেখতে আগ্রহী করে, মন্তব্য করতে বা শেয়ার করতে উৎসাহিত করে, তাহলে সেটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেশি দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ইউটিউবের ওয়াচ-পেজে দীর্ঘ ভিডিও ও লাইভ স্ট্রিম থেকেও বিজ্ঞাপন এবং ইউটিউব প্রিমিয়ামভিত্তিক আয় করার সুযোগ রয়েছে।

এখানেই তৈরি হয় একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন-

তাহলে কি কখনো কখনো একটি ‘ভালো আলোচনা’র চেয়ে একটি ‘ভালো ঝগড়া’ বেশি লাভজনক হয়ে উঠছে?

অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেল বা অনুষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে ঝগড়া বাধিয়ে ভিউ বাড়ায়—এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া দেওয়া ঠিক নয়। তবে ভিউ, এনগেজমেন্ট ও বিজ্ঞাপননির্ভর ডিজিটাল অর্থনীতি যে উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্টকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই।

‘খোঁচা’ কি কখনো কৌশল?

টকশোতে সঞ্চালকের কাজ প্রশ্ন করা। কঠিন প্রশ্ন করা, পাল্টা প্রশ্ন করা এবং বক্তব্যের অসঙ্গতি তুলে ধরা-এসব সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অংশ।

কিন্তু কঠিন প্রশ্ন আর ইচ্ছাকৃত উসকানির মধ্যে পার্থক্য আছে।

কোনো আলোচককে বারবার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে উত্তেজিত করা, একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে করা, অন্য অতিথির বক্তব্য দিয়ে তাকে ক্ষুব্ধ করা কিংবা এমন মন্তব্য সামনে আনা যার উদ্দেশ্য বিতর্ককে তথ্য থেকে ব্যক্তিগত সংঘাতে নিয়ে যাওয়া—এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

কারণ দর্শক যদি অনুভব করেন, ‘আজ কী বলা হবে’ নয়, ‘আজ কে কার সঙ্গে ঝগড়া করবে’—এটাই অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ, তাহলে টকশোর চরিত্র বদলে যায়।

বিতর্ক দরকার, অপমান নয়

গণতান্ত্রিক সমাজে মতবিরোধ অপরিহার্য। বরং শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন তীব্র মতের লড়াই। একজন বলবেন এক কথা, অন্যজন তার বিরোধিতা করবেন। তথ্য দিয়ে ভুল ধরিয়ে দেবেন। যুক্তি দিয়ে পাল্টা যুক্তি দেবেন।

কিন্তু মতের বিরোধিতা আর ব্যক্তিকে অপমান করা এক বিষয় নয়।

একজন আলোচক যখন বলেন, ‘আপনি ভুল বলছেন’, সেটি বিতর্ক।

কিন্তু যখন বলেন, ‘আপনি কিছুই জানেন না’, ‘আপনি মিথ্যাবাদী’, কিংবা ব্যক্তিগত অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করেন, তখন আলোচনা অন্য জায়গায় চলে যায়।

আর যখন হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন সেটি আর টকশো থাকে না; সেটি হয়ে যায় একটি টেলিভিশনীয় সংঘাতের দৃশ্য।

দর্শকেরও দায় আছে

শুধু চ্যানেল বা আলোচকদের দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। দর্শকের আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যদি প্রতিবার গালাগালির ভিডিও লাখ লাখবার দেখি, শেয়ার করি, মন্তব্যে উসকানি দিই এবং সেই ক্লিপকে ভাইরাল করি, তাহলে আমরা নিজেরাই সেই বাজার তৈরি করছি।

একটি উত্তপ্ত ভিডিওর নিচে হাজার হাজার মন্তব্য জমে। কেউ একজনের পক্ষ নেন, অন্যজন আরেকজনের। শুরু হয় দ্বিতীয় দফার যুদ্ধ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের কয়েক মিনিটের উত্তেজনা তখন ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের ব্যক্তিগত নিউজফিডে।

ইউটিউবের সুপারিশব্যবস্থাও দর্শকের আগের দেখার অভ্যাস, ওয়াচ হিস্ট্রি, লাইক, শেয়ার, মন্তব্যসহ নানা সংকেত ব্যবহার করে কনটেন্ট সুপারিশ করে।

ফলে দর্শক যা বেশি দেখেন, তার মতো কনটেন্ট আরও সামনে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

সঞ্চালকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

একটি টকশোর সঞ্চালক শুধু প্রশ্নকর্তা নন। তিনি আলোচনার নিয়ন্ত্রকও।

অতিথিরা উত্তেজিত হলে তাঁকে পরিস্থিতি শান্ত করতে হবে। কেউ ব্যক্তিগত আক্রমণে গেলে থামাতে হবে। অশালীন ভাষা ব্যবহার হলে সতর্ক করতে হবে। পরিস্থিতি হাতাহাতির দিকে গেলে সম্প্রচার নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তুতিও থাকতে হবে।

কারণ ‘লাইভ’ শব্দটির অর্থ এই নয় যে যা ঘটছে, সবকিছুই অনিয়ন্ত্রিতভাবে দর্শককে দেখাতে হবে।

বরং লাইভ সম্প্রচারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতেও কে কতটা দায়িত্বশীল থাকতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আমাদেরই

টকশো কেন দেখি?

দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে? ভিন্নমত শুনতে? যুক্তি ও তথ্যের লড়াই দেখতে?

নাকি দেখতে চাই, আজ কে কার সঙ্গে ঝগড়া করলেন?

যদি দ্বিতীয় উত্তরটি ধীরে ধীরে সত্যি হয়ে ওঠে, তাহলে সমস্যা শুধু টেলিভিশনের নয়; সমস্যাটি আমাদের গণমাধ্যম সংস্কৃতিরও।

ভিউ, রেটিং, ক্লিক, শেয়ার, সবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে দর্শক ও আয় প্রয়োজন। কিন্তু সেই দৌড়ে যদি তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা, যুক্তির চেয়ে গালাগালি এবং আলোচনার চেয়ে সংঘাত বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, আমরা কি সংবাদ ও মতামতের অনুষ্ঠান দেখছি, নাকি সাজানো উত্তেজনার বিনোদন?

একটি ভালো টকশোর সাফল্য হওয়া উচিত, আলোচনা শেষে দর্শক নতুন কিছু জানলেন, ভিন্নমত বুঝলেন, নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবলেন।

কেউ চেয়ার ছুড়লেন কি না, কে গালি দিলেন, কে রেগে অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন-এসব দিয়ে যদি অনুষ্ঠানের সাফল্য মাপা শুরু হয়, তাহলে একসময় টকশো আর ‘টক’ থাকবে না।

থাকবে শুধু ‘শো’।

আর সেই শোর সবচেয়ে বড় জ্বালানি হবে-আমাদের কৌতূহল, আমাদের ক্লিক এবং আমাদের ভিউ।

এমএজেড
আরও পড়ুন