রাষ্ট্রপতি ভবনের নোটিশ প্রত্যাহার

কেন অনিশ্চিত তারেক রহমানের ভারত সফর?

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০১:১২ পিএম

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর ঘিরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল সফরের তারিখ নির্ধারণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই দেশের সম্পর্কের স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, কূটনৈতিক আস্থার ঘাটতি এবং শেষ মুহূর্তের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিয়ে দিল্লির অস্বাভাবিক অবস্থান। ২১ আগস্ট ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার এই জটিলতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

শুক্রবার দুপুরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন জানায়, ২২ আগস্টের নিয়মিত ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে না। কারণ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার পূর্ণ মহড়ার কথা উল্লেখ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই ধারণা তৈরি হয় যে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি ভবন সেই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করে নেয়। প্রত্যাহারের কারণও প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।

ঘটনাটির গুরুত্ব এখানেই যে, দুই দেশের কোনো পক্ষই তখন পর্যন্ত সফরের চূড়ান্ত তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। ফলে রাষ্ট্রপতি ভবনের বিজ্ঞপ্তি কার্যত সফরের সম্ভাব্য প্রস্তুতির একটি সরকারি ইঙ্গিত হিসেবে সামনে আসে। পরে তা প্রত্যাহার করায় সফরের সময়সূচি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সফরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়নি। বরং ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ভারত সফর নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি এবং শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।

অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও শুক্রবার সফর নিয়ে কোনো নতুন তথ্য দিতে পারেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, এ মুহূর্তে এ বিষয়ে বলার মতো কিছু নেই; অগ্রগতি হলে জানানো হবে।

অর্থাৎ, সফর বাতিল—এমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই; আবার ২৩-২৫ আগস্টের কথিত সফরও নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক পরিকল্পনা আপাতত এগোচ্ছে না এবং দুই পক্ষ পরবর্তী কোনো তারিখ নিয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

সফরকে ঘিরে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জট তৈরি হয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তাঁকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নিজস্ব আইনি কাঠামোর আওতায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

১৬ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে বলেছিল, তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের অনুরোধে ভারতের দ্রুত পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করা হয়।

এর কয়েক দিন আগে ৫ আগস্ট দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করে। বাংলাদেশ ওই বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে। ফলে সফরের প্রস্তুতির পাশাপাশি রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্নটিও সামনে চলে আসে।

রাষ্ট্রপতি ভবনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রত্যাহারের ঘটনাকে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি প্রশাসনিক বা যোগাযোগগত ভুলও হতে পারে। তবে এর সময়কাল এবং সফর নিয়ে আগে থেকেই চলমান টানাপোড়েনের কারণে ঘটনাটি কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কারণ, একটি রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা, সামরিক আনুষ্ঠানিকতা ও রাষ্ট্রপতি ভবনের আয়োজন সাধারণত সফরের সময়সূচি চূড়ান্ত হওয়ার পরই এগোয়। সেখানে সফর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই এমন প্রস্তুতির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পাওয়া এবং পরে তা প্রত্যাহার হওয়া দুই দেশের আলোচনার ভেতরে থাকা অনিশ্চয়তাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও বিষয়টিকে সফর নিয়ে বিভ্রান্তির নতুন কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

তবে পুরো পরিস্থিতিকে কেবল বিরোধ বা সংঘাত হিসেবে দেখলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তারেক রহমানকে ভারত দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও অংশ নেওয়ার সুযোগের কথা জানিয়েছে ভারতীয় পক্ষ। দুই দেশের মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, দিল্লি ও ঢাকা উভয় পক্ষই সম্পর্ককে পুরোপুরি অচল অবস্থায় নিতে চায় না। বরং মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি কার্যকর সম্পর্কের কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দুই দেশের মধ্যে ব্যাকচ্যানেল বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের কথাও এসেছে।

তারেক রহমানের ভারত সফরটি তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়াদিল্লিতে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়ার কারণে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি অনুষ্ঠিত হলে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের প্রতীকী সূচনা হতে পারত। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।

কিন্তু সফর শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেলে বিপরীত বার্তাও যেতে পারে—বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এখনো দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রীয় বাধা হয়ে আছে, এমন ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

অন্যদিকে, সফরকে তাড়াহুড়ো করে আয়োজন না করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরির পর অনুষ্ঠিত হলে সেটি আরও ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ‘আস্থা, পারস্পরিক সম্মান ও উপযুক্ত পরিবেশ’-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। প্রথমত, আগস্টের পরবর্তী কোনো সময়ে সফরের নতুন তারিখ নির্ধারণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ব্রিকস-সংশ্লিষ্ট কোনো বহুপক্ষীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে দুই নেতার বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তৃতীয়ত, প্রত্যর্পণসহ দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে কিছু অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত সফর আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

সর্বশেষ তথ্য বলছে, দুই দেশ যোগাযোগ বন্ধ করেনি। বরং সফরের সময়সূচি এবং রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে আলোচনা চলছে।

সুতরাং রাষ্ট্রপতি ভবনের নোটিশ প্রত্যাহারকে এককভাবে সফর বাতিলের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন এক সময়ে ঘটে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যখন ঢাকা ও নয়াদিল্লি একই সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা এবং কয়েকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। 

এমএজেড
আরও পড়ুন