ইমাম আলী (রা.)-এর মাজার ঘিরে কীভাবে নাজাফ হয়ে উঠলো বিশাল ধর্মীয় নগরী

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

মক্কার কাবা শরিফ ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। ঐতিহাসিক বর্ণনায় হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর জন্মগ্রহণ করেন মক্কায়। কিন্তু তাঁর মাজার অবস্থিত ইরাকের নাজাফে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, জন্ম মক্কায় হলে মাজার ইরাকে কেন?

হজরত আলী (রা.) ছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাতো ভাই এবং জামাতা। ঐতিহাসিক সূত্রে তাঁর জন্ম আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টাব্দে মক্কায়। তাঁর পিতা ছিলেন আবু তালিব মহানবী (সা.)-এর চাচা। পরবর্তী সময়ে আলী (রা.) মহানবী (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে বড় হন।

শৈশব থেকেই তিনি মহানবী (সা.)-এর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে মদিনা ও পরবর্তী সময়ে ইরাকের কুফাকে কেন্দ্র করে।

অর্থাৎ তাঁর জন্মস্থান ও সমাধিস্থল যে একই জায়গায় হতে হবে এমন কোনো ঐতিহাসিক নিয়ম ছিল না। বরং তাঁর জীবনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের শেষ পর্যায় তাঁকে ইরাকের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে।

কীভাবে আলী (রা.) ইরাকে গেলেন?

মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে আলী (রা.)-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি খলিফা নির্বাচিত হন।

খলিফা হওয়ার পর তাঁর শাসনের কেন্দ্র মদিনা থেকে ইরাকের কুফায় স্থানান্তরিত হয়। কুফা তখন দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল।

এ সময় থেকেই আলী (রা.)-এর জীবনের শেষ কয়েক বছর মূলত ইরাককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। Encyclopaedia Iranica-র তথ্য অনুযায়ী, কুফা ছিল তাঁর রাজনৈতিক রাজধানী এবং ৬৫৬ থেকে ৬৬১ সাল পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে শাসন পরিচালনা করেন।

এই সময়েই সংঘটিত হয় জামাল ও সিফফিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত এবং শেষ পর্যন্ত নাহরাওয়ানের যুদ্ধ।

কুফার মসজিদে হামলা, তারপর মৃত্যু

৬৬১ খ্রিস্টাব্দে কুফার মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় খারিজি গোষ্ঠীর আবদুর রহমান ইবনে মুলজাম বিষমাখা তরবারি দিয়ে আলী (রা.)-কে আঘাত করেন।

দুই দিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। Encyclopaedia Iranica-র ঐতিহাসিক জীবনীতে তাঁর মৃত্যুর তারিখ ১৯ বা ২১ রমজান ৪০ হিজরি ২৭ জানুয়ারি ৬৬১ খ্রিস্টাব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বয়স ছিল আনুমানিক ৬৩ বছর।

কিন্তু মৃত্যুর পরই শুরু হয় তাঁর কবরকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কেন কবর গোপন রাখা হয়েছিল?

আলী (রা.)-এর সমাধিস্থল দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে রাখা হয়নি বলে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সূত্রে উল্লেখ আছে।

এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়, তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা যাতে কবর খুঁড়ে মরদেহের অবমাননা করতে না পারে, সে জন্য দাফনের স্থান গোপন রাখা হয়েছিল।

Encyclopaedia Iranica বলছে, তাঁর মৃত্যুর পর কবরের অবস্থান গোপন রাখা হয়েছিল এবং তা তাঁর বংশধর ও ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

শিয়া ঐতিহ্যেও বলা হয়, আলী (রা.)-এর নির্দেশেই তাঁর কবর এমন জায়গায় রাখা হয়েছিল, যাতে শত্রুরা তা শনাক্ত করতে না পারে।

সেই গোপন কবরই কি আজকের নাজাফ?

শিয়া মুসলিমদের প্রধান ঐতিহ্য অনুযায়ী, হ্যাঁ।

তাঁকে কুফার পশ্চিমে বর্তমান নাজাফের এলাকায় দাফন করা হয়েছিল বলে শিয়া ঐতিহ্যে স্বীকৃত। Encyclopaedia Iranica-ও উল্লেখ করেছে, অধিকাংশ শিয়া আলেম আলী (রা.)-এর সমাধিস্থল বর্তমান নাজাফে বলে মনে করেন।

অর্থাৎ এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি

আলী (রা.) নাজাফে জন্মগ্রহণ করেননি; তাঁর জন্ম মক্কায়। নাজাফ হলো তাঁর সমাধিস্থল হিসেবে পরিচিত স্থান।

নাজাফ তখন আজকের মতো শহর ছিল না

আলী (রা.) যখন সেখানে সমাধিস্থ হন, তখন বর্তমান নাজাফ আজকের মতো বিশাল ধর্মীয় নগরী ছিল না।

Encyclopaedia Iranica জানায়, আলী (রা.)-এর সমাধির আগে ওই এলাকা ছিল তুলনামূলক নিরিবিলি। সেখানে কিছু খ্রিস্টান মঠ ও স্থানীয় বসতি ছিল। আলী (রা.)-এর সমাধিকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ইউনেস্কোর একটি প্রকাশনাতেও বলা হয়েছে, নাজাফ মূলত একটি নির্জন সমাধিস্থল হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং আলী (রা.)-এর সমাধিকে ঘিরেই পরবর্তী সময়ে শহরটির বিকাশ ঘটে।

অর্থাৎ বলা যায়, আলী (রা.)-এর সমাধি নাজাফকে পরিচিত করেছে; নাজাফ আলী (রা.)-কে নয়।

কখন সাধারণ মানুষ কবরের সন্ধান পেল?

এখানে ইতিহাসের সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্যের মিশ্রণ রয়েছে।

কিছু শিয়া ঐতিহ্য অনুযায়ী, আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদের সময় আলী (রা.)-এর কবরের অবস্থান পুনরায় প্রকাশ্যে আসে। একটি জনপ্রিয় বর্ণনায় বলা হয়, শিকার করতে গিয়ে হারুন আল-রশিদ ওই স্থান সম্পর্কে জানতে পারেন এবং পরে সেখানে স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে Encyclopaedia Iranica সতর্ক করে বলছে, আলী (রা.)-এর সমাধির অবস্থান প্রকাশ এবং প্রথম স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে।

অন্য একটি ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়েছে, আব্বাসীয় আমলে কবরের ওপর ছোট স্থাপনা নির্মাণের কথাও বর্ণিত হয়েছে।

অর্থাৎ মাজারটির প্রাথমিক ইতিহাস নিয়ে সব সূত্রের বিবরণ এক নয়।

নাজাফ কীভাবে বিশাল ধর্মীয় নগরীতে পরিণত হলো?

আলী (রা.)-এর কবরকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে নাজাফে তীর্থযাত্রা শুরু হয়।

৯ম থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যে বিভিন্ন শাসক ও ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকের সহযোগিতায় সমাধির ওপর স্থাপনা নির্মাণ ও সম্প্রসারণ হতে থাকে।

প্রায় ৯২৪ সালের দিকে হামদানীয় শাসক আবুল হাইজার আমলে সমাধির ওপর বড় গম্বুজ ও দুর্গসদৃশ সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কথা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।

এরপর ৯৪৯ সালে বুয়াইহিদ শাসক আজুদ আল-দাওলা আলী (রা.)-এর সমাধির ওপর একটি বড় মাজার নির্মাণ করেন বলে Encyclopaedia Iranica উল্লেখ করেছে।

সেখান থেকেই ধীরে ধীরে নাজাফ হয়ে ওঠে শিয়া ইসলামের অন্যতম প্রধান তীর্থ ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।

মাজার বহুবার আক্রান্ত হয়েছে

নাজাফের মাজারের ইতিহাস শুধু ধর্মীয় শ্রদ্ধার ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত এবং ধ্বংসের ঘটনাও।

১০৫১-৫২ সালের দিকে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সময় মাজারে আগুন লাগানোর ঘটনা ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মাজার পুনর্নির্মাণ করা হয়।

এরপর বিভিন্ন শাসনামলে মাজারটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে। সাফাভি শাসকদের আমলে এর ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। শাহ আব্বাস প্রথম মাজার কমপ্লেক্স পুনর্নির্মাণ করেন এবং পরবর্তী শাসকেরা এর বিভিন্ন অংশ সম্প্রসারণ করেন।

১৮০৩ সালেও ওয়াহাবি বাহিনীর হামলার মুখে মাজারটি পড়ে বলে Encyclopaedia Iranica-র ইতিহাসে উল্লেখ আছে।

বর্তমান মাজার দেখতে কেমন?

আজকের ইমাম আলী মাজার নাজাফ শহরের কেন্দ্রীয় ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি।

মাজারটির সবচেয়ে দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হলো সোনালি গম্বুজ ও মিনার। ভেতরের অংশে রুপালি অলংকরণ, আয়না ও নকশাদার টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। সমাধির ওপর রয়েছে রুপার তৈরি জিয়ারতস্থান।

এই স্থাপনাকে ঘিরেই নাজাফে গড়ে উঠেছে বিশাল ধর্মীয় অবকাঠামো মাদ্রাসা, গ্রন্থাগার, বাজার, আবাসন ও তীর্থযাত্রীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, নাজাফ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীকে আকর্ষণ করে এবং শহরটির ধর্মীয় ও শিক্ষাগত গুরুত্ব বহু শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছে।

ওয়াদি আল-সালাম মাজারের পাশের বিশাল কবরস্থান

নাজাফের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম জড়িয়ে আছে ওয়াদি আল-সালাম।

এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কবরস্থান। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় থাকা এই স্থানের আয়তন প্রায় ৯১৭ হেক্টর বলে ইরাকের দাখিল করা তথ্যের ভিত্তিতে ইউনেস্কো জানিয়েছে।

এখানে লাখ লাখ মানুষের সমাধি রয়েছে এবং আলী (রা.)-এর মাজারের নিকটবর্তী হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের শিয়া মুসলিমদের কাছে এর বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে।

তবে আলী (রা.)-এর কবর নিয়ে মতপার্থক্যও আছে

ইতিহাসের এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন।

নাজাফের মাজারকে আলী (রা.)-এর সমাধি হিসেবে শিয়া মুসলিমদের প্রধান ঐতিহ্য স্বীকৃতি দিলেও সব ঐতিহাসিক বর্ণনা একই নয়।

Encyclopaedia Iranica জানিয়েছে, মধ্যযুগের কিছু সুন্নি ঐতিহাসিক আলী (রা.)-এর কবরের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ কুফার অন্য জায়গা, কেউ ইরাকের অন্য স্থান এবং কেউ ইরাকের বাইরের স্থানও উল্লেখ করেছেন। তবে অধিকাংশ শিয়া আলেম নাজাফকেই তাঁর সমাধিস্থল হিসেবে গ্রহণ করেন।

অন্যদিকে ইমাম আলী মাজারের নিজস্ব কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক ব্যাখ্যায় নাজাফের সমাধিকে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বর্ণনার ভিত্তিতে আলী (রা.)-এর প্রকৃত সমাধি হিসেবে সমর্থন করেছে এবং এর বিপরীত মতগুলো খণ্ডনের চেষ্টা করেছে।

তাই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন করার ক্ষেত্রে “নাজাফে আলী (রা.)-এর মাজার” বলা যথাযথ; কিন্তু সব ঐতিহাসিক সূত্রে সমাধিস্থলের অবস্থান নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই এমন দাবি করা ঠিক হবে না।

জন্মস্থান আর সমাধিস্থল-দুই ভিন্ন ইতিহাস

পুরো বিষয়টি এক বাক্যে বললে

হজরত আলী (রা.)-এর জন্ম মক্কায়, তাঁর জীবনের শেষ রাজনৈতিক অধ্যায় কুফায়, মৃত্যু কুফায় এবং তাঁর সমাধি শিয়া ঐতিহ্য ও অধিকাংশ শিয়া আলেমের মতে কুফার পশ্চিমে বর্তমান নাজাফে।

এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই মক্কার সন্তান আলী (রা.)-এর সঙ্গে ইরাকের নাজাফের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

নাজাফের উত্থানও তাই নিছক একটি শহরের ইতিহাস নয়। একটি গোপন সমাধিকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে তীর্থনগরী, ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র এবং শিয়া ইসলামের অন্যতম প্রধান জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।

আজ নাজাফের আকাশে সোনালি গম্বুজ দূর থেকে দেখা যায়। কিন্তু সেই গম্বুজের ইতিহাস আসলে শুরু হয়েছিল কোনো রাজপ্রাসাদ বা নগর পরিকল্পনা দিয়ে নয় একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের গোপন সমাধিকে ঘিরে।

সেই ব্যক্তিত্বই হজরত আলী (রা.) মক্কায় যার জন্ম, কুফায় যার রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় এবং নাজাফে যার সমাধি আজ কোটি মানুষের কাছে শ্রদ্ধা ও তীর্থের কেন্দ্র।

সূত্র: Encyclopaedia Iranica, UNESCO এবং ইমাম আলী মাজারের নিজস্ব ঐতিহাসিক নথি এগুলো মিলিয়ে ফিচারটি তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে জন্মস্থান ও সমাধিস্থল নিয়ে ঐতিহাসিক মতপার্থক্যটি ইচ্ছাকৃতভাবে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে।

এএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত