হাদিসের আলোকে জুমার দিনের ফজিলত ও আমল

নিশ্চয় জুমার দিন হল সমস্ত দিনের সর্দার। জুমার দিন আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে মহান দিবস। এমনকি এই দিন আল্লাহ তাআলার কাছে ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর তথা ইসলামের দুই ঈদের দিন থেকেও মহান। 

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৪, ০৬:৫৪ পিএম

মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের একটি বিশেষ দিন জুমা। অন্যান্য দিনের তুলনায় এই দিনটির ফজিলত অনেক বেশি। হাদিসের একাধিক বর্ণনায় ওঠে এসেছে জুমার নামাজ পড়ার ফজিলত ও মর্যাদা। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, সূর্য উঠা দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এ দিন আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এ দিন তাঁকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, এ দিনটিতেই কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। (মুসলিম)

জুমার দিনের বিশেষ ফজিলত

জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার অন্যতম একটি বিষয় হল, এ দিন কালক্রমে সংঘটিত এমন কিছু মহাঘটনার নীরব সাক্ষী, যা পৃথিবীর মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল বা পৃথিবীকে নবজীবন দান করেছিল। এমনিভাবে এ দিনই সংঘটিত হবে ঐ মহাপ্রলয়, যা এই নশ্বর পৃথিবীর সমাপ্তি ঘটিয়ে এক অবিনশ্বর জগতের সূচনা করবে। বদরী সাহাবী আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনযির রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ سَيِّدُ الْأَيّامِ وَأَعْظَمُهَا عِنْدَ اللهِ مِنْ يَوْمِ الْأَضْحَى وَيَوْمِ الْفِطْرِ، فِيهِ خَمْسُ خِلَالٍ: خَلَقَ اللهُ فِيهِ آدَمَ، وَأَهْبَطَ اللهُ فِيهِ آدَمَ، وَفِيهِ تَوَفّى اللهُ آدَمَ، وَفِيهِ سَاعَةٌ لَا يَسْأَلُ اللهَ الْعَبْدُ فِيهَا شَيْئًا إِلّا أَعْطَاهُ إِيّاهُ، مَا لَمْ يَسْأَلْ حَرَامًا، وَفِيهِ تَقُومُ السّاعَةُ، مَا مِنْ مَلَكٍ مُقَرّبٍ، وَلَا أَرْضٍ وَلَا سَمَاءٍ، وَلَا رِيَاحٍ وَلَا جِبَالٍ وَلَا بَحْرٍ، إِلّا وَهُنّ مُشْفِقُونَ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ.

নিশ্চয় জুমার দিন হল সমস্ত দিনের সর্দার। জুমার দিন আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে মহান দিবস। এমনকি এই দিন আল্লাহ তাআলার কাছে ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর তথা ইসলামের দুই ঈদের দিন থেকেও মহান।

জুমার দিনের বিশেষ পাঁচটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ দিন আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করেছেন। এ দিন তাঁকে জান্নাত থেকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। এদিনেই আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু দান করেছেন। জুমার দিন একটা সময় আছে, যাতে বান্দা আল্লাহর কাছে যা চাইবে আল্লাহ তাআলা তাকে তা-ই দান করবেন, যদি না সে হারাম কোনো বিষয়ের প্রার্থনা করে। তদ্রূপ, কিয়ামতও সংঘটিত হবে জুমার দিনেই।

নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা পর্যন্ত  জুমার দিন (কিয়ামতের আশঙ্কায়) ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে। পৃথিবী, আকাশ, বাতাস, পাহাড়, পর্বত, সাগর সবকিছু জুমার দিন (কিয়ামতের আশঙ্কায়) উদ্বিগ্ন থাকে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ৫৫৫৯; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৫৪৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১০৮৪১

জুমার দিনের আমল

জুমার দিনের সবচেয়ে বড় আমল হল, অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জুমার নামায আদায় করা। ভালোভাবে পাক-পবিত্র হয়ে পরিষ্কার ও উত্তম জামা-কাপড় পরিধান করে শুরু ওয়াক্তে মসজিদে চলে যাওয়া এবং নামায ও দুআ-যিকিরে মগ্ন থাকা। এরপর একাগ্রতার সাথে ইমাম সাহেবের খুতবা শোনা এবং উত্তমরূপে জুমার নামায আদায় করা। এটাই হল, জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বাধিক ফজিলতের আমল। হাদীস শরীফে এই আমলের অনেক ফজিলতের কথা এসেছে।

এক সপ্তাহের গোনাহ মাফ হয়ে যায়

আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

الْجُمْعَةُ إِلَى الْجُمْعَةِ، كَفّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُنّ، مَا لَمْ تُغْشَ الْكَبَائِرُ.

এক জুমা থেকে আরেক জুমা মধ্যবর্তী সময়ের (গোনাহের) জন্য কাফ্ফারা (পাপমোচনকারী), যদি কাবীরা গোনাহ না করা হয়। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১০৮৬; জামে তিরমিযী, হাদীস ৪১৪; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ১৮১৪

সালমান ফারসী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

>تَدْرُونَ مَا يَوْمُ الْجُمُعَةِ<؟ قَالَ: قُلْتُ: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. ثُمّ قَالَ: >تَدْرُونَ مَا يَوْمُ الْجُمُعَةِ<؟ قُلْتُ: اللهُ عَزّ وَجَلّ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: قُلْتُ فِي الثّالِثَةِ أَوِ الرّابِعَةِ: هُوَ الْيَوْمُ الّذِي جُمِعَ فِيهِ أَبُوكَ أَوْ أَبُوكُمْ. قَالَ: >لَكِنِّي أُخْبِرُكَ بِخَبَرِ يَوْمِ الْجُمُعَةِ، مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَتَطَهّرُ ثُمّ يَمْشِي إِلَى الْمَسْجِدِ، ثُمّ يُنْصِتُ، حَتّى يَقْضِيَ الْإِمَامُ صَلَاتَهُ، إِلّا كَانَتْ كَفّارَةَ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ يَوْمِ الْجُمُعَةِ الّتِي قَبْلَهَا، مَا اجْتُنِبَتِ الْمَقْتَلَةُ.

(قال الحاكم: هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ. وقال الهيثمي: رواه الطبراني في الكبير وإسناده حسن.)

তুমি জানো, জুমার দিন কী?

উত্তর দিলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক অবগত আছেন।

তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জানো, জুমার দিন কী?

আমি একই জবাব দিলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালো জানেন।

তিনি তৃতীয়বার প্রশ্ন করলেন, বল তো জুমার দিন কী?

আমি তৃতীয়বার বা চতুর্থবার বললাম, জুমা হল ঐ দিন, যাতে আদম আলাইহিস সালামকে জমা করা হয়েছে। (অর্থাৎ তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে।)

তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (এসব কিছু না।) বরং আমি তোমাকে জুমার দিনের খবর (আসল ফজিলত) সম্পর্কে অবগত করছি। কোনো মুসলিম যদি পবিত্র হয়ে জামে মসজিদের দিকে হাঁটতে থাকে, এরপর ইমাম নামায শেষ করা পর্যন্ত নীরব থাকে তাহলে এ নামায এই জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত তার গোনাহসমূহের কাফ্ফারা (মোচনকারী) হয়ে যাবে, যদি ধ্বংসকারী তথা কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। -শারহু মুশকিলিল আছার, হাদীস ৩৮২৮; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ১৭৩২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩৭২৯; সুনানে কুবরা, নাসাঈ, হাদীস ১৬৭৭: মুজামে কাবীর, তবারানী ৬/২৩৭ (৬০৮৯) মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ১০২৮

আবু সাঈদ খুদরী রা. ও আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، وَلَبِسَ مِنْ أَحْسَنِ ثِيَابِهِ، وَمَسّ مِنْ طِيبٍ إِنْ كَانَ عِنْدَهُ، ثُمّ أَتَى الْجُمُعَةَ، فَلَمْ يَتَخَطّ أَعْنَاقَ النّاسِ، ثُمّ صَلّى مَا كَتَبَ اللهُ لَهُ، ثُمّ أَنْصَتَ إِذَا خَرَجَ إِمَامُهُ، حَتّى يَفْرُغَ مِنْ صَلَاتِهِ، كَانَتْ كَفّارَةً لِمَا بَيْنَهَا وَبَيْنَ جُمُعَتِهِ الّتِي قَبْلَهَا.

যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, তার কাছে থাকা সুন্দরতম জামাটি পরিধান করল এবং সংগ্রহে থাকলে সুগন্ধি ব্যবহার করল, এরপর জুমাতে উপস্থিত হল, কারো কাঁধ ডিঙ্গিয়ে গেল না, তারপর আল্লাহর তাওফীক অনুযায়ী সুন্নত-নফল পড়ল, অতঃপর খতীব (খুতবার জন্য) বের হওয়া থেকে নামায শেষ করা পর্যন্ত নিশ্চুপ থাকল, তার এই নামায এ জুমা থেকে সামনের জুমা পর্যন্ত (গোনাহের) কাফ্ফারা হবে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৪৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১১৭৬৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ২৭৭৮; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ১৭৬২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ১০৪৬৫

সালমান আলখায়ের (সালমান ফারসী) রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لاَ يَغْتَسِلُ رَجُلٌ يَوْمَ الجُمُعَةِ، وَيَتَطَهّرُ مَا اسْتَطَاعَ مِنْ طُهْرٍ، وَيَدّهِنُ مِنْ دُهْنِهِ، أَوْ يَمَسّ مِنْ طِيبِ بَيْتِهِ، ثُمّ يَخْرُجُ فَلاَ يُفَرِّقُ بَيْنَ اثْنَيْنِ، ثُمّ يُصَلِّي مَا كُتِبَ لَهُ، ثُمّ يُنْصِتُ إِذَا تَكَلّمَ الإِمَامُ، إِلّا غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الجُمُعَةِ الأُخْرَى.

যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করবে, সাধ্যমত পরিচ্ছন্নতা অর্জন করবে,৬ তেল ব্যবহার করবে বা নিজের ঘরে থাকা আতর মাখবে, এরপর জুমার দিকে বের হবে, (মসজিদে গিয়ে একসাথে থাকা) দুইজনের মাঝে গিয়ে বসবে না, যত রাকাত সম্ভব নামায পড়বে, এরপর ইমাম যখন খুতবা দেন তখন চুপ থাকবে। যে কেউই এসব করবে তাকেই এই জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত মাফ করা হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৮৩; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ৫৫৬৩

 

RH
আরও পড়ুন