‘ওয়োক’ তকমা নিয়ে তীব্র বিতর্কের দুই বছর পর নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি উন্মোচন করেছে জাগুয়ার। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নতুন মডেল টাইপ ০১ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে বিলাসবহুল বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের নতুন করে প্রতিষ্ঠার বড় ধরনের বাজি ধরেছে কোম্পানিটি। মূল প্রতিষ্ঠান জেএলআর এ পরিকল্পনায় কয়েকশ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ করেছে।
টাইপ ০১ চার দরজার একটি বিলাসবহুল গ্র্যান্ড ট্যুরার। গাড়িটির দীর্ঘ সামনের অংশে ষাটের দশকের জাগুয়ার ই-টাইপের নকশার ছাপ রাখা হয়েছে। তবে এর দামও বেশ চড়া। যুক্তরাজ্যে গাড়িটির সর্বনিম্ন দাম ১ লাখ ৩০ হাজার পাউন্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ ডলার।
গাড়িটিতে রয়েছে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক মোটর, যা প্রায় ১ হাজার অশ্বশক্তি উৎপন্ন করতে পারে। শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬২ মাইল গতিতে পৌঁছাতে গাড়িটির সময় লাগে মাত্র ৩ দশমিক ২ সেকেন্ড। জেএলআরের দাবি, মহাসড়কে নিরবচ্ছিন্ন গতিতে চললে একবার চার্জে গাড়িটি সর্বোচ্চ ৩২০ মাইল পর্যন্ত যেতে পারবে।
কোম্পানিটি টাইপ ০১-কে এখন পর্যন্ত তৈরি সবচেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর, শক্তিশালী ও বায়ুগতিবিদ্যাগতভাবে উন্নত জাগুয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে উন্মোচনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাড়িটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এর নকশার তীব্র সমালোচনা করেছেন। আবার গাড়ি সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ জাগুয়ারের সাহসী নকশার প্রশংসা করেছেন।
একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী গাড়িটিকে টেসলার সাইবারট্রাক ও বেন্টলি কন্টিনেন্টালের অদ্ভুত সংমিশ্রণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিলাসবহুল গাড়ি পরামর্শক ক্রেইগ কিনার্সলি নতুন নকশাকে বিপর্যয়কর বলে মন্তব্য করে বলেন, এটি শববাহী গাড়ির মতো দেখায় এবং এতে জাগুয়ারের স্মরণীয় বৈশিষ্ট্যের অভাব রয়েছে।
তবে গাড়ি সাংবাদিক স্টিভ ফাওলার টাইপ ০১-এর নকশাকে অসাধারণ বলে প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, গাড়িটি তাঁকে ব্রিটিশ হিসেবে গর্বিত করেছে। গাড়ি বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম এডমন্ডসের আলিস্টেয়ার উইভারও নকশাটিকে মেরুকরণকারী হলেও জাগুয়ারের এমন সাহসী নকশার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে কৃতিত্ব দিয়েছেন।
তবে উইভারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জাগুয়ারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে, কারণ সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা কমছে।
‘ওয়োক’ বিতর্কের শুরু যেভাবে
জাগুয়ারের নতুন গাড়ির এই উন্মোচন দুই বছর আগের তীব্র বিতর্কের ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি নতুন ব্র্যান্ড ভাবমূর্তি তুলে ধরে একটি অদ্ভুত বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। বিজ্ঞাপনে উজ্জ্বল রঙের বিচিত্র পোশাকে মডেলদের দেখা গেলেও কোনো গাড়ি দেখানো হয়নি। একই সময়ে নতুন জাগুয়ার লোগোও উন্মোচন করা হয়।
এর দুই সপ্তাহ পর জাগুয়ারের নকশাপ্রধান জেরি ম্যাকগভর্ন মায়ামিতে গোলাপি ও নীল রঙের দুটি একেবারে ভিন্নধর্মী ধারণাভিত্তিক গাড়ি প্রদর্শন করেন। এগুলো ছিল এমন নকশার নমুনা, যা ভবিষ্যৎ গাড়ির ধারণা তুলে ধরার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সড়কে চলার উপযোগী পূর্ণাঙ্গ গাড়ি নয়।
ম্যাকগভর্ন তখন বলেছিলেন, জাগুয়ার সবার ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা করছে না। কিন্তু ওই আয়োজনের পর সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, জেএলআর নিজেদের ঐতিহ্য থেকে সরে গিয়ে ‘ওয়োক’ সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে। এমনকি গাড়ির প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত উজ্জ্বল গোলাপি রঙ নিয়েও বিদ্রূপ শুরু হয়।
জাগুয়ারকে বিলাসবহুল সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্র্যান্ডে রূপান্তরের পরিকল্পনা অবশ্য ২০২৩ সালের শুরুতেই নেওয়া হয়েছিল। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি নতুন গাড়ি ও প্রযুক্তিতে ১৫০০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিল।
একসময় ষাটের দশকের ব্রিটিশ সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত প্রতীক হিসেবে পরিচিত জাগুয়ার পরে বাজারে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সমস্যায় পড়ে। ব্রিজিত বার্দো ও স্টিভ ম্যাককুইনের মতো তারকারা একসময় জাগুয়ারের ই-টাইপ ব্যবহার করলেও পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিলাসবহুল গাড়িগুলো মধ্যম সারির করপোরেট নির্বাহীদের কাছে অডি ও বিএমডব্লিউর মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
স্বয়ংচালিত খাতের গবেষক ম্যাথিয়াস শ্মিট বলেন, বিতর্ক যতই হোক, জাগুয়ারের মূল ক্রেতারা অনেক আগেই ব্র্যান্ডটি থেকে সরে গিয়েছিল। ফলে নতুন করে হারানোর মতো খুব বেশি কিছু প্রতিষ্ঠানটির হাতে ছিল না।
জাগুয়ারের ‘শেষ বাজি’
২০২৪ ও ২০২৫ সালে জাগুয়ার তাদের পুরোনো মডেলগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেয়। ‘ওয়োক’ বিতর্ক প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বকে সাময়িকভাবে অস্বস্তিতে ফেললেও এর মাধ্যমে জাগুয়ার আবারও জনআলোচনায় আসে।
টাইপ ০১ জাগুয়ারের নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ির তিনটি মডেলের প্রথমটি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে নতুন ব্র্যান্ড প্রচারণার পেছনে থাকা বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে জেএলআর। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর পদেও পরিবর্তন এসেছে।
তবে নতুন গাড়ি বাজারে এনে জাগুয়ারের ভবিষ্যৎ ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। গাড়ি সাংবাদিক স্টিভ ফাওলারের ভাষায়, এটি সত্যিই জাগুয়ারের জন্য শেষ বড় বাজিগুলোর একটি। অতীতে জাগুয়ার থেকে বড় ধরনের মুনাফা করতে জেএলআর হিমশিম খেয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সূত্র: বিবিসি
অণুর আয়না-রহস্য ভেদে রসায়নে নোবেল দুই বিজ্ঞানীর
ঝামেলা ছাড়াই যেভাবে থামাবেন বিরক্তিকর কল
বিশ্বে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কাজ করে ৫০ লাখের বেশি রোবট
মানুষের মস্তিষ্ক আসলে দুটি পৃথক অঙ্গ!