বাংলাদেশ উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের কাতারে প্রবেশের পর রপ্তানি খাতে সরকারের দেওয়া সরাসরি নগদ প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিতে পারবে না। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন খসড়া রপ্তানি নীতি ২০২৪-২০২৭ এর অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এতে ২০২৪-২৭ মেয়াদে ১১০ বিলিয়ন বা ১১ হাজার কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানি নীতিতে বিকল্প হিসেবে এ খাত সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করতে সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খসড়া রপ্তানি নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।
এদিকে বিদ্যমান রপ্তানি নীতি ২০২১-২০২৪ এর মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। আর ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার পর ওই সময় রপ্তানিমুখী খাতগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরাসরি নগদ প্রনোদনার বিকল্প হিসেবে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

গত ১৫ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার সচিব মো. মাহমুদুল হোসাইন খান জানিয়েছেন, রপ্তানি নীতি ২০২৪-২০২৭ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এতে ২০২৪-২০২৭ মেয়াদে ১১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করার জন্য আর্থিক প্রণোদনার বিকল্প পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রপ্তানি প্রক্রিয়ায় অনুসরণ করা বিভিন্ন ধাপ এখানে (রপ্তানি নীতি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সচিব আরো বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, রপ্তানি খাতের চাহিদা এবং বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে প্রতি তিন বছর অন্তর রপ্তানি নীতি প্রণয়ন করা হয়।
এদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মে বলা হয়, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলো সরাসরি রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিতে পারবে না।
খসড়া রপ্তানি নীতিতে বিকল্প হিসেবে রপ্তানিকারকদের জন্য যা থাকছে
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সঙ্গে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেছে সরকার। এতে করে রপ্তানিকারকরা স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল হিসেবে ঋণ নিতে পারবেন। পণ্য উন্নয়ন ও রপ্তানিযোগ্য পণ্য বহুমুখীকরণে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা পাবে। গুদামজাত ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা, বিদেশি বিপণনের দক্ষতা বাড়ানো ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপনে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস বিলে ১০ শতাংশ কর রেয়াত। শিল্প প্রতিষ্ঠানে এ সুযোগ বা ব্যবহারের ওপর যৌক্তিক খরচ নির্ধারণ করবে। ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহারের ক্ষেত্রে রেয়াত দেওয়া যায় কিনা তা খতিয়ে দেখা। মেশিনারিজ ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে লাইসেন্সিং ফি ও সব ধরণের শুল্ক ছাড়। রপ্তানি আয়ের ২ দশমিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা থাকবে সেবা খাতে। রপ্তানিকারক শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
রপ্তানি নীতির খসড়ায় আরো বলা হয়, বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশন রপ্তানি উন্নয়নের সমস্যা ও সুবিধাগুলো চিহ্নিত করার জন্য পরিষেবা বিভাগে প্রেরণ করবে। খসড়ায় বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং, নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করা ও শিল্প প্রদর্শনীর জন্য সেবা খাতকে তুলে ধরতে বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলো মাধ্যমে প্রচারণা চালানো ও পণ্য ও সেবা খাতের ভার্চুয়াল বাজার উন্নয়নে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া। পরামর্শক, সফটওয়্যার ইমপ্লিমেন্টেশন, ডাটা প্রসেসিং, ডাটাবেজড আইটি, নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড লিগ্যাল, অ্যাকাউন্টিং, হিসাবরক্ষণ ও আর্কিটেকচারাল, রেন্টাল অ্যান্ড লিজিং সার্ভিসের মতো কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শাক-সবজি ও হস্তশিল্পকে সর্বোচ্চ রপ্তানি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্পিনিং, ডাইং, প্রিন্টিং, ফেব্রিকস ও ফিনিশিংকে বিশেষ উন্নয়নশীল খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর চিকিৎসা সরঞ্জাম ও হস্তশিল্পকে ২০২৪ সালের পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের সর্বশেষ রপ্তানি পরিস্থিতি তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের ( ২০২৩-২৪) দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৪৪৭ কোটি ১৭ লাখ ডলার। যা এর আগের অর্থবছরের একইসময় হয়েছিল ৪ হাজার ৫৬৭ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় চলতি দশ মাসে রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
এ সময়ে সরকারের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৯৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। এতে করে লক্ষ্য থেকে রপ্তানি আয় কমেছে ৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ। সর্বশেষ অর্থবছরটিতে (২০২২-২৩) মোট রপ্তানি আয় এসেছিল ৫ হাজার ৫৫৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। এছাড়া ২০২৩-২৪ পুরো অর্থবছরের জন্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার।
রপ্তানি খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে চলমান নানা সংকট এখনও অব্যাহত রয়েছে। একাধিক দেশের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি, ডলারের উচ্চমূল্য, মূল্যস্ফীতি বেপরোয়া গতি সব কিছুর সাথে চ্যালেঞ্জিং হয়েছে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেকটা বেগ পেতে হবে। তবে দেশের ব্যবসা বাণিজ্যে যেসব সমস্যা এখন রয়েছে গেছে সেগুলো থেকে বের হতে না পারলে লক্ষ্য পূরণ আরো কঠিন হয়ে পড়বে।
