রিক্রুটিং এজেন্টদের অনিয়মে বন্ধ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৪, ১২:১৭ পিএম

রিক্রুটিং এজেন্টদের সিন্ডিকেট অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার আবারও বন্ধ হয়ে গেলো। সৌদি আরবের পর মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় শ্রমবাজায়। অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে এর আগেও কয়েকবার বন্ধ করা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া। তবে সর্বশেষ ৩১ মে বন্ধ হওয়ার বিষয়টি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি আলোচিত। এবারের বন্ধ হওয়ার কারণ দুই দেশের অনিয়মের বিষয়টি জাতিসংঘ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

৩১ মে মধ্যে মালয়েশিয়া প্রবেশের সময় বেধে দিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ নিয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তি দেয় ১৬ মে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে অধিক শ্রমিক মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত ৩১ হাজারের অধিক শ্রমিক দেশ ত্যাগ করতে পারেননি।

হঠাৎ করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়া এবং সব বৈধ ডকুমেন্ট হাতে পেয়েও মালয়েশিয়ায় যেতে না পারার পেছনে বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়া উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ে সিন্ডিকেট জড়িত থাকার বিষেয়ে অভিযোগ উঠেছে। এদের অন্যতম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমিনুল ইসলাম বিন আবদুল নূর। তিনি মালয়েশিয়ার নাগরিক, আমিন নূর নামে পরিচিত। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) সফটওয়্যার মাইগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট-এর মালিকানায় রয়েছেন আমিন নূর। যার মাধ্যমে এজেন্সি চূড়ান্ত করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়া থেকে আমিন নূর কর্মী পাঠানোর পুরো বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। বাংলাদেশে তার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন ওরফে স্বপন। শুরুতে মালয়েশিয়ার কর্মী পাঠানোর চক্রে ছিল ২৫টি এজেন্সি। এরপর ধাপে ধাপে মোট ১০০ বেসরকারি এজেন্সি অনুমোদন পায়, এর সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারি এজেন্সি বোয়েসেল। যদিও অন্য কোনো দেশে কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে এভাবে এজেন্সি ঠিক করে দেয় না মালয়েশিয়া।

বাংলাদেশে এ সিন্ডিকেটের মূল হোতা বায়রা নেতা রুহুল আমিন স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন দিলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে এ বিষয়ে কথা হয় বায়রার যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই সিন্ডিকেটের মাধ্যেমে মালয়েশিয়ার শ্রমিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সব এজেন্সিকে শ্রমিক পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতো না। সরকারের মধ্যে কারো কারো নাম এসেছে। আবার সরকারের কাছের লোক হিসেবে যারা শ্রমিক পাঠিয়েছে সবাই এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের টাকা ফেরত পাওয়া উচিত। এজেন্সি এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বহীনতার কারণেই এতো টাকা দিয়েও শ্রমিকরা যেতে পারেনি বলেও তিনি দাবি করেন।

মালয়েশিয়া শ্রমিক যেতে না পারার বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ করতে না পারার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংকটের জন্য যে বা যারা দায়ী প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের নিয়ন্ত্রণে জনপ্রতিনিধিসহ গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। বছরের পর বছর সংসদ সদস্যসহ প্রভাবশালীরা প্রতারণা করলেও জড়িতরা থাকছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সবশেষ তাদের প্রতারণার শিকার ৩১ হাজার কর্মী। যাদের স্বপ্নের সঙ্গে প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া হলো দেড় হাজার কোটি টাকা।

কথা হয় এমনি একজন শ্রমিকের সঙ্গে। রাজশাহীর বাগমারার আবু বক্কর জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ৬ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন ফুয়াং ট্রাভেলস এজেন্সির হাতে। কথা ছিল ৩১ মে মালয়েশিয়ায় যাবে ছেলে তোফায়েল। তবে ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করতেই জানা গেল, এজেন্সির দেওয়া টিকিট ভুয়া। বারবার ফোন করলেও জবাব নেই রিক্রুটিং এজেন্সির। বাকরুদ্ধ আবু বকর কানানায় ভেঙে পড়েন। তার মতো আরও ১৭ জন শ্রমিকের বিমান টিকেট ভুয়া হিসেবে চিহিৃত হয়।

এ বিষয়ে বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়ার অনুমতি পাওয়া শ্রমিকদের নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে শ্রমিকদের ভাগ্যে কি আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা এই মুহুর্তে বলতে পারবো না। দুদিন হলো শ্রমিক নেওয়া বন্ধ হয়েছে। তাই অগ্রগতি নিয়ে কিছু বলতে পারবো না। এদিকে অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম এসেছে তাদের বিষয়ে কিছু বলতে চাননি। তবে মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রীর সঙ্গে এক হয়ে কাজ করার কথা বলেন তিনি।

এদিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নিউ হ্যাভেন, এলিগেন্ট, আল ফারাহসহ অনেকের নাম এসেছে। বছরের পর বছর অনেক নামের এজেন্সির প্রতারণা অব্যাহত থাকলেও অদৃশ্য কারণে হয়নি প্রতিকার। পর্দার আড়ালে কুশীলবদের মাঝে আছেন সংসদ সদস্যসহ প্রভাবশালীরা। যাদের হাতের ইশারায় ভাগ্য বদলায় শ্রমবাজারের, সেখানকার কর্মীদের। তবে মালয়েশিয়ার শ্রমিক পাঠাতে গিয়ে গড়ে ৫ লাখ টাকা করে হলেও এজেন্সিগুলোর পকেটে গেছে দেড় হাজার কোটি টাকা।

MB/FI
আরও পড়ুন