চোটের বাধা পেরিয়ে নিজের সেরা সময়ের অপেক্ষায় নাসিম শাহ

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম

রাওয়ালপিন্ডির মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ফিরে নিজের চেনা গতির ঝলক দেখিয়েছেন পাকিস্তানের তরুণ পেসার নাসিম শাহ। সাত মাস চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকার পর প্রথম টি-টোয়েন্টিতে চার ওভারে ৩৬ রান দিয়ে তিন উইকেট নেন তিনি। প্রথম বলেই উইকেট তুলে নেওয়ার পাশাপাশি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করে বুঝিয়ে দেন, তাঁর সহজাত ধার এখনো অটুট। তবে নাসিমের কাছে কেবল গতির ঝলক দেখানোই যথেষ্ট নয়; নিজের সেরা ক্রিকেট এখনো খেলতে পারেননি বলে মনে করেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য, চোটের বাধা পেরিয়ে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করা এবং ২০২৭ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা।

বর্তমানে ২৪তম জন্মদিনের তিন মাসেরও কম সময় বাকি নাসিমের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৯৩ ম্যাচে তাঁর শিকার ১৫৫ উইকেট। এর মধ্যে টেস্টে ৩৫.১৩ গড়ে ৬০টি এবং ওয়ানডেতে ২৫.৯১ গড়ে ৬০টি উইকেট নিয়েছেন তিনি। ওয়ানডেতে তাঁর স্ট্রাইক রেট ২৮.৩। পরিসংখ্যান বলছে, নিজের প্রতিভার ঝলক তিনি একাধিকবার দেখিয়েছেন। তবে সেই সামর্থ্যকে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।

চলতি সপ্তাহে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাসিম বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমি এখনো আমার সেরা ক্রিকেট খেলিনি। এখন পর্যন্ত যত ক্রিকেট খেলেছি, বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে, আমার মনে হয় কিছু বিষয়ে আমার ঘাটতি ছিল।’

তাঁর এই উপলব্ধির পেছনে রয়েছে অল্প বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উঠে আসা, দ্রুত পরিচিতি পাওয়া এবং বারবার চোটের কারণে থমকে যাওয়া এক ক্যারিয়ার। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাইবার পাখতুনখোয়ার লোয়ার দিরের মায়ার এলাকায় জন্ম নেওয়া নাসিম মাত্র ১৬ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত হন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকের সময় তাঁর অনেক সমবয়সী তখনো স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেনি।

এর মাত্র তিন মাস পর রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে হ্যাটট্রিক করেন নাসিম। তখন তাঁর বয়স ১৬ বছর ৩৫৯ দিন। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি গড়েন তিনি। অল্প বয়সে এমন অর্জনের পর পাকিস্তানের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে তাঁকে ঘিরে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়। আগ্রাসী ভঙ্গিতে দৌড়ে এসে দ্রুতগতির বল করার ধরন তাঁকে অতীতের বিখ্যাত ফাস্ট বোলারদের সঙ্গে তুলনার জায়গায় নিয়ে যায়।

নাসিমের শুরুর সময়টা ছিল সাফল্যে ভরা। ১৬ বছর বয়সেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্টে পাঁচ উইকেট নেন তিনি। পরে ওয়ানডেতেও টানা দুই ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখান। ২০২২ সালের আগস্টে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৩৩ রানে পাঁচ উইকেট নেওয়ার পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৭ রানে পাঁচ উইকেট নেন। পরপর দুই ওয়ানডে ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়া পাকিস্তানের ষষ্ঠ বোলার হন তিনি।

সাদা বলের ক্রিকেটে নতুন বলে ধার তৈরি করা, পুরোনো বলে রিভার্স সুইং আদায় করা এবং ব্যাটারের পরিকল্পনা বুঝে বল করার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে দক্ষতা বাড়িয়েছেন নাসিম। তাঁর মতে, দ্রুতগতির বোলিংয়ে আগ্রাসনের পাশাপাশি বুদ্ধিমত্তাও জরুরি। দুটির সমন্বয় ছাড়া কার্যকর বোলার হয়ে ওঠা কঠিন।

কিন্তু যে শরীর তাঁকে এমন গতি ও ধার দিয়েছে, সেটিই বারবার তাঁর পথ আটকে দিয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে পিঠের চোটের কারণে এক বছরেরও বেশি সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। এরপর কাঁধের সমস্যাও দেখা দেয়। ২০২৩ সালের এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে টেন্ডনে চোট পাওয়ার ঘটনা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় ধাক্কা। অস্ত্রোপচার করাতে হওয়ায় ওই বছরের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের হয়ে খেলতে পারেননি তিনি। দল যখন বিশ্বকাপের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাঁকে মাঠের বাইরে বসে থাকতে হয়।

চোটের প্রভাব সম্পর্কে নাসিম বলেন, ‘চোটে পড়লে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। কখনো কখনো এমন অবস্থা হয় যে দৌড়াতেও পারেন না, খেলার অনুশীলন তো অনেক পরের কথা। এ সময় পুনর্বাসন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিজের শরীরকে কতটা ভালোভাবে বুঝতে পারছেন, সেটিও তখন অত্যন্ত জরুরি।’

এ বছরের পাকিস্তান সুপার লিগে খেলতে গিয়ে আবারও পিঠের চোটে পড়েন নাসিম। নিজের বোলিংয়ের ছন্দ ফিরে পেতে শুরু করার সময়ই এই চোট তাঁকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়। জাতীয় দলের বাইরেও থাকতে হয় সাত মাস। পুনর্বাসনের দীর্ঘ সময়ে ভোরে উঠে অনুশীলন, পরিকল্পিতভাবে শরীরের শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম এবং মানসিকভাবে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে বোলিং সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে।

কৈশোরের আগ্রাসী পেসার নাসিম এখন শুধু গতি নয়, ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে বল করা, বৈচিত্র্য কাজে লাগানো এবং নিজের শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী বোলিং করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘তরুণ বয়সে আপনি জানেন কীভাবে দ্রুত বল করতে হয়। কিন্তু আপনি কী করতে চাইছেন, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বে অনেক ফাস্ট বোলার আছেন, যাঁরা ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করেন, কিন্তু ধারাবাহিক নন। এক-দুই ম্যাচ খেলেই তাঁরা চোটে পড়েন।’

নাসিমের উপলব্ধি, ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করলেই হবে না। যদি প্রতিপক্ষ অনায়াসে রান তুলে নেয় এবং কয়েকটি ম্যাচের মধ্যেই শরীর ভেঙে পড়ে, তাহলে সেই গতির কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যায়। নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্যের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শক্তি ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত বোলিং করা, নিয়মিত পারফর্ম করা এবং ব্যাটারের সঙ্গে কথার লড়াইয়ের পর হঠাৎ ধীরগতির বল করে তাঁকে চমকে দেওয়ার মতো কৌশলও চোটের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন তিনি।

আধুনিক সাদা বলের ক্রিকেটে ব্যাটারদের অনুকূলে থাকা পিচ এবং খেলার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বোলারদের নিয়মিত নিজেদের কৌশল বদলাতে হয়। নাসিমও মনে করেন, সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকতে হলে বোলারদের নতুন নতুন উপায় খুঁজে বের করতে হবে। শুধু গতি নয়, সঠিক সময়ে সঠিক বলটি করতে পারাই হয়ে উঠতে পারে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী বিষয়।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রত্যাবর্তন সিরিজে নাসিমের পারফরম্যান্সে সেই পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত মিলেছে। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে প্রতিপক্ষের ওপরের সারির ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলার পর ইনিংসের শেষ দিকেও নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেন তিনি। দ্বিতীয় ম্যাচে কোনো উইকেট না পেলেও পাওয়ারপ্লেতে তাঁর বোলিংয়ে মাত্র ৯ রান তুলতে পারে শ্রীলঙ্কা। উইকেট না পেলেও রান আটকে রাখার এই পারফরম্যান্স সিরিজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। শেষ পর্যন্ত তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জেতে পাকিস্তান।

এখন নাসিমের নজর ২০২৭ সালের বিশ্বকাপে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠেয় এই প্রতিযোগিতায় ৮ অক্টোবর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পাকিস্তানের অভিযান শুরুর কথা রয়েছে। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে চোটের কারণে খেলতে না পারার হতাশার পর এটি হতে পারে তাঁর প্রথম সিনিয়র বিশ্বকাপ। এর আগে ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে অনুষ্ঠেয় আসন্ন ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজের পাকিস্তান দলেও রয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির পথে এটিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন এই পেসার।

৩৪টি ওয়ানডেতে নাসিম ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য দেখিয়েছেন। তবে এখন তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সেই পারফরম্যান্স দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা। চোটের কারণে ক্যারিয়ারের লক্ষ্য বারবার বদলাতে হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। নাসিম বলেন, ‘আপনি একটা লক্ষ্য ঠিক করেন। কিন্তু চোট এবং ক্যারিয়ারের উত্থান-পতনের সঙ্গে সঙ্গে সেই লক্ষ্যও বদলে যায়। তবে আমি ঠিক করেছিলাম, একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে ক্রিকেট খেলতে চাই। আমার মনে হয়, আমার সেরা ক্রিকেট এখনো সামনে।’

পেছনে ফিরে নাসিম ভাবেন, পিচ, নিজের শরীর এবং খেলার চাহিদা সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা থাকলে হয়তো আরও বেশি অর্জন করতে পারতেন। তবে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এখন তাঁর মনোযোগ বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করার দিকে। দিরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই তরুণ একসময় বিস্ময়বালক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। এরপর তাঁকে পেরোতে হয়েছে চোটের ধাক্কা, পুনর্বাসনের নিঃসঙ্গ সময় এবং প্রত্যাশার চাপ।

তাঁর ক্যারিয়ারে বাধা এসেছে, মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে দীর্ঘ সময়, আর প্রতিটি প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছে নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ। তারপরও তাঁর বলের গতি ও মুভমেন্ট এখনো আছে, পাশাপাশি খেলাটি সম্পর্কে বেড়েছে উপলব্ধি। এখন তাঁর লক্ষ্য শুধু মাঝে মাঝে দুর্দান্ত বোলিং করা নয়; বরং একের পর এক সিরিজে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের দায়িত্ব নেওয়া।

২০২৭ সালের বিশ্বকাপ এখন আর দূরের কোনো লক্ষ্য নয়। নিজের ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায় গড়ে তোলার জন্য নাসিমের সামনে এটি একটি নির্দিষ্ট মাইলফলক। ১৬ বছর বয়সে টেস্টে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকে চমকে দেওয়া সেই তরুণ এবার ২৪ বছর বয়সে নিজের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারবেন কি না, সেটিই দেখার বিষয়। নাসিম নিজে অবশ্য বিশ্বাস করেন, তাঁর সেরা সময় এখনো আসেনি। সূত্র: ডন

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত