বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’ শুরু হতে যাচ্ছে আগামী (১১ জুন), বৃহস্পতিবার। ফুটবল ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই টুর্নামেন্টটি এবার অনন্য এক রেকর্ডের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা জুড়ে একযোগে একাধিক ঐতিহাসিক ও আন্তঃসংযুক্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পর্দা উঠবে এই মহোৎসবের।
১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করলেও, কানাডার জন্য এটিই প্রথম অভিজ্ঞতা। ১৬টি আয়োজক শহরে রেকর্ড সংখ্যক ১০৪টি ম্যাচের এই বৈশ্বিক আয়োজন ১১ই জুন মেক্সিকোতে উদ্বোধনী ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়ে আগামী ১৯শে জুলাই, রবিবার নিউইয়র্কের ফাইনালের মাধ্যমে শেষ হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদন সূত্রে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হলো।
তিনটি আন্তঃসংযুক্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও থিম
এবারের আসরে মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে তিনটি ভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও সেগুলো একটি অভিন্ন বিষয়বস্তু বা থিমের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। এই থিমের মূল লক্ষ্য—তিনটি দেশকে একত্রিত করা এবং সীমানা পেরিয়ে মানুষকে আপন করে নেওয়ার ফুটবলের যে অনন্য ক্ষমতা, তা ফুটিয়ে তোলা। প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সৃজনশীল প্রতিভাকে এই মঞ্চে উপস্থাপন করবে।
অনুষ্ঠানগুলোর নেপথ্যে প্রধান সৃজনশীল পরিচালক হিসেবে রয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট ও অলিম্পিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞ প্রযোজক মার্কো বালিচ (২০২৬ সালের শীতকালীন গেমসেরও পরিচালক)। বালিচের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কানাডাকে উপস্থাপন করা হবে একটি ‘সাংস্কৃতিক মোজাইক’ হিসেবে, মেক্সিকোকে তুলে ধরা হবে ঐতিহ্যবাহী ‘পাপেল পিকাডো’ শিল্পের মাধ্যমে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দেখানো হবে একটি ‘চকচকে ও উজ্জ্বল কাপ’ হিসেবে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেন, "মেক্সিকো সিটি থেকে শুরু করে টরন্টো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে চলতে থাকা এই অনুষ্ঠানগুলো সঙ্গীত, সংস্কৃতি এবং ফুটবলকে এমনভাবে একত্রিত করবে যা প্রতিটি জাতির স্বকীয়তা এবং এই টুর্নামেন্টের মূল ভিত্তি যে ঐক্য, উভয়কেই প্রতিফলিত করবে।"
‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর তথ্য অনুযায়ী, মেক্সিকো সিটির অনুষ্ঠানটি প্রায় ১৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ড এবং টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের অনুষ্ঠান দুটি প্রতিটি প্রায় ১৩ মিনিট স্থায়ী হবে। অনুষ্ঠান শেষে মাঠ খেলোয়াড়দের ওয়ার্ম-আপের জন্য দেওয়া হবে। এরপর কিক-অফের ২৫ মিনিট আগে শুরু হবে খেলোয়াড়দের মাঠে প্রবেশ ও অফিশিয়াল প্রোটোকল পর্ব, যা চলবে প্রায় ১৩ মিনিট। প্রতিটি অনুষ্ঠানই নিজ নিজ ভেন্যুর ম্যাচ শুরুর ঠিক ৯০ মিনিট আগে শুরু হবে।
তিন দেশের উদ্বোধনী ভেন্যু, সময়সূচী ও পারফর্মারদের তালিকা
১. মেক্সিকো সিটি (১১ই জুন, বৃহস্পতিবার)
২০১০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে (পূর্বে এস্তাদিও আজতেকা নামে পরিচিত) প্রথম উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানটিতে আদিবাসী শিল্পী, সমসাময়িক লোকনৃত্য এবং ঐতিহ্যবাহী পাপেল পিকাডো শিল্পের সমাহার ঘটবে।
কারা থাকছেন পারফর্ম্যান্সে: ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল অ্যালবামের তারকা শিল্পী আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ, বেলিন্ডা, ড্যানি ওশান, জে বালভিন, লিলা ডাউনস, লস অ্যাঞ্জেলেস আজুলেস এবং মানা। আরও থাকছেন দক্ষিণ আফ্রিকার গায়ক-গীতিকার টাইলা। এছাড়া বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে শাকিরা বার্না বয়ের সাথে তার ‘দাই দাই’ (ইতালীয় শব্দ, যার অর্থ “চলো যাই”) গানটি পরিবেশন করবেন। (উল্লেখ্য, শাকিরা, ম্যাডোনা এবং কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস আগামী ১৯শে জুলাই ফাইনাল ম্যাচের হাফটাইম শো-তেও সহ-প্রধান শিল্পী হিসেবে থাকবেন)।
বিশেষ ঘোষণা: উদ্বোধনী দিন মেক্সিকো সিটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। স্কুল বন্ধ থাকবে এবং দূরবর্তী কাজ (রিমোট ওয়ার্ক) উৎসাহিত করা হয়েছে। স্টেডিয়াম এলাকায় প্রবেশাধিকার কেবল টিকিটধারী ও স্বীকৃত ব্যক্তিদের জন্য সীমিত থাকবে।
মেক্সিকোর সময়সূচী (স্থানীয় ও জিএমটি):
০৯:০০ (১৫:০০ জিএমটি): স্টেডিয়ামের গেট খোলা
১১:০০ (১৭:০০ জিএমটি): উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু
১২:১০ (১৮:১০ জিএমটি): দলগুলোর ওয়ার্ম-আপ
১৩:০০ (১৯:০০ জিএমটি): মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (উদ্বোধনী ম্যাচ)
২. টরন্টো, কানাডা (১২ই জুন, শুক্রবার)
কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য এই আসরটি দেশটির পুরুষ ফুটবল দলের জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, কারণ এটিই তাদের নিজেদের মাটিতে খেলা প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। অনুষ্ঠানটি শুরু হবে একটি বিশেষ কাউন্টডাউনের মাধ্যমে, যা দর্শকদের "এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত" কানাডা ভ্রমণের আবহ দেবে। ‘সাংস্কৃতিক মোজাইক’ থিমে কানাডার বৈচিত্র্য তুলে ধরা হবে।
কারা থাকছেন পারফর্ম্যান্সে: অ্যালানিস মরিসেট, অ্যালেসিয়া কারা, এলিয়ানা, জেসি রেয়েজ, মাইকেল বুলে, নোরা ফাতেহি, সঞ্জয়, ভেজেড্রিম এবং উইলিয়াম প্রিন্স।
কানাডার সময়সূচী:
১৩:৩০ (১৭:৩০ জিএমটি): উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু
১৫:০০ (১৯:০০ জিএমটি): কানাডা বনাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (ম্যাচ শুরু)
(অনুষ্ঠান শেষে আনুষ্ঠানিক প্রাক-ম্যাচ কার্যক্রম ও ওয়ার্ম-আপ সম্পন্ন হবে)
৩. লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র (১২ই জুন, শুক্রবার)
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকবে বিশাল মাপের ভিজ্যুয়াল ও আকর্ষণীয় গল্প বলার ভঙ্গি। ফিফা সভাপতি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক ডায়াস্পোরা এবং বিশ্ব পপ সংস্কৃতিতে দেশটির প্রভাব মাথায় রেখে শিল্পী তালিকা সাজানো হয়েছে।
কারা থাকছেন পারফর্ম্যান্সে: কেটি পেরি, ফিউচার, অনিতা, লিসা, রেমা এবং টাইলার।
যুক্তরাষ্ট্রের সময়সূচী:
১৬:৩০ (২৩:৩০ জিএমটি): উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু
১৮:০০ (১৩ই জুন ০১:০০ জিএমটি): যুক্তরাষ্ট্র বনাম প্যারাগুয়ে (ম্যাচ শুরু)
দর্শক সমাগম ও সরাসরি সম্প্রচার তথ্য
ফিফা আনুষ্ঠানিক কোনো সংখ্যা প্রকাশ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে, তিন দেশের তিনটি স্টেডিয়ামই দর্শকে পূর্ণ থাকবে এবং সম্মিলিতভাবে প্রায় ২,০০,০০০ দর্শক সরাসরি গ্যালারিতে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করবেন। এছাড়া বৈশ্বিক টেলিভিশন ও অনলাইনের মাধ্যমে কয়েক কোটি বা শত কোটি দর্শক এটি সরাসরি দেখবেন।
যেভাবে দেখা যাবে (টেলিভিশন ও স্ট্রিমিং):
যুক্তরাষ্ট্র: ইংরেজি ভাষায় FOX ও FS1 এবং স্প্যানিশ ভাষায় Telemundo ও Universo। বিনামূল্যে স্ট্রিমিংয়ের জন্য ‘Tubi’ অ্যাপে ১১ ও ১২ই জুনের উদ্বোধনী ম্যাচ ও অনুষ্ঠান দেখা যাবে। এছাড়া ‘FOX One’ অ্যাপ (সাবস্ক্রিপশন আবশ্যক) এবং স্প্যানিশ ভাষাভাষীদের জন্য ‘Peacock’ ও ‘Telemundo’ অ্যাপে লাইভ থাকবে।
কানাডা: CTV, TSN এবং RDS।
মেক্সিকো: Televisa এবং TV Azteca।
যুক্তরাজ্য: BBC এবং ITV।
আয়োজকদের লজিস্টিকস ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
বিশ্বকাপের মতো এত বড় আয়োজনকে ঘিরে তিন দেশেই কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, যা মোকাবিলায় প্রশাসন তৎপর:
মেক্সিকো সিটি: শিক্ষক ইউনিয়নসহ কিছু গোষ্ঠীর চলমান বিক্ষোভের কারণে উদ্বোধনী ম্যাচের আগে বিশৃঙ্খলা এবং স্টেডিয়ামের প্রধান সড়কগুলো অবরোধের হুমকি রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযানের মাধ্যমে আশ্বস্ত করেছে যে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কোনো ঝুঁকিতে নেই।
লস অ্যাঞ্জেলেস: স্থানীয় কর্মকর্তারা ভিড় ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা পরিকল্পনায় জোর দিয়েছেন। তবে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে, বিশ্বকাপ ভেন্যুগুলোতে কোনো ধরনের অভিবাসন প্রয়োগ (ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট) অভিযান চালানো হবে না।
টরন্টো: বিপুল পর্যটকের চাপ সামলাতে পরিবহন সংস্থাগুলো বিশেষ পরিষেবা বাড়াচ্ছে এবং যানজট নিরসনে লজিস্টিকসকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা