সুন্দর সংসারের প্রত্যাশায় প্রায় সব নারী-পুরুষই শত অনুযোগ, অভিযোগ, যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করেন। আমাদের সমাজে দেখা যায় যে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ভয়াবহ কলহ থাকলেও সহজে তারা আলাদা হতে চান না। শতরকমের হতাশা বুকে নিয়ে মুখে হাসি রেখে অভিনয় করে কাটিয়ে দিতে চান সারাটা জীবন। এটাই আধুনিক সভ্যতার নিদর্শন। তবে এসব কপটতাকে বুড়ো আঙুল দেখানো দেশের নাম মৌরিতানিয়া। দেশটিতে ডিভোর্স হওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এমনকি ডিভোর্সের বিষয়টিকে পার্টি করে উদযাপনও করা হয়।
প্রায় শতভাগ মুসলমানের দেশ মৌরিতানিয়ায় প্রায়ই ডিভোর্সের ঘটনা ঘটে। অনেক মানুষের জীবনে বিয়ে আসে ৫ থেকে ১০ বার। কারও কারও জীবনে ২০ বারও বিয়ের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটিতে ‘অপ্রীতিকর ও অস্বাস্থ্যকর’ বাস্তবতায় সংসার চালিয়ে নেওয়ার নজির খুবই কম।
সে দেশের দম্পতিরা এমন ক্ষেত্রে একে অপরকে মুক্তি দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সই করেন ডিভোর্স পেপারে। কোনো নারীর ডিভোর্স হলে কান্নার রোল ওঠে না, তাকে লজ্জায় মুখ লুকাতে হয় না, পদে পদে অপমানিত হতে হয় না। বিশ্বের অন্য অনেক অঞ্চলেই ডিভোর্স মানে রীতিমতো বিভীষিকা হলেও মৌরিতানিয়ার পরিস্থিতি এমন নয়।
দেশটিতে বিবাহবিচ্ছেদ খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এখানে ডিভোর্স বিষয়টিকে উদযাপন করা হয় এবং সবাইকে আরো জানিয়ে দেওয়া হয় যে, এই নারী এখন মুক্ত এবং পুনরায় বিবাহ করতে পারেন। শতকের পর শতক ধরে দেশটিতে এমন রীতিই চলে এসেছে; ডিভোর্স পার্টিতে এসে নারীরা একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করেন, গান গান এবং নাচেন।
তবে বর্তমানে সেলফি প্রজন্মের কাছে এই পার্টির ধরন কিছুটা বদলেছে। আজকাল তারা ডিভোর্স পার্টিতে কেক নিয়ে আসে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এই উদযাপনের ছবি পোস্টও করে; সেইসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সঙ্গীত তো আছেই।
দেশটির কোনো কোনো পণ্ডিতের ভাষ্যে, মৌরিতানিয়ায় ডিভোর্সের হার বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও এ সম্পর্কে সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না মৌরিতানিয়ায়, কারণ বেশিরভাগ সময়ই মুখে মুখে এসব ডিভোর্স হয়ে থাকে, কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায় না।
মৌরিতানিয়ার সমাজে নারীদের নিয়ে গবেষণা করে সমাজবিজ্ঞানী নাজওয়া আল কাত্তাব বলেন, মৌরিতানিয়ায় ডিভোর্স এতটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে ওঠার আংশিক কারণ হলো, মৌররা তাদের বার্বার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে শক্তিশালী ‘মাতৃতান্ত্রিক প্রবণতা’ পেয়েছে। ডিভোর্স পার্টির মাধ্যমে যাযাবর সম্প্রদায় একজন নারীর বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কে সবাইকে জানান দিত।
অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর তুলনায় মৌরিতানিয়ায় নারীদের স্বাধীনতা বেশিই বলা চলে। তারা আলাদা একটা ক্যারিয়ারও বেছে নিতে পারে, যেটা ‘মাতৃতান্ত্রিক ক্যারিয়ার’। আল কাত্তাব আরও বলেন, ‘তরুণী, ডিভোর্সি নারী এখানে কোনো সমস্যার বিষয় না। বরং এখানে ডিভোর্সি নারীদের আরো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হিসেবে দেখা হয় বলে তাদের চাহিদা আরও বেশি’।
