অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের আগামী দিনের বাজেট যেমন হওয়া উচিত 

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম

কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ঘোড়া, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। এমন এক জটিল সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে আগামী ১১ জুন বর্তমান সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।

এই বাজেট কেবল একটি নিয়মিত বার্ষিক আর্থিক হিসাবনিকাশ নয়, বরং একে দেখা হচ্ছে সংকটে পড়া সামষ্টিক অর্থনীতিকে টেনে তোলার, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর এবং সাধারণ মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি মহাপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ হিসেবে। বিশেষ করে দেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের পথে রয়েছে, তখন এবারের বাজেট একই সাথে নতুন সম্ভাবনা তৈরি এবং এলডিসি-পরবর্তী আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা মোকাবিলার এক মোক্ষম হাতিয়ার।

গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে এক ধরণের স্থবিরতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। যদিও সরকার আগামী অর্থবছরে এটি ৫ শতাংশে উন্নীত করার আশা করছে, তবে বাস্তব পরিস্থিতি বেশ কঠিন। মূল্যস্ফীতির পারদ প্রতিনিয়ত ওপরের দিকে উঠছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, এপ্রিলে তা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বৃদ্ধি এই মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিতে, যা গত মার্চ পর্যন্ত ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ এই দুর্বলতার কারণে বৈশ্বিক যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা বাংলাদেশের বাজারে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সরকার ২০২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বড় ও সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, যার আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হলেও তা অর্জনের পথ মোটেও মসৃণ নয়।

অর্থনীতিকে পুনরায় দ্রুত প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে এনে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়াতে হলে কয়েকটি মৌলিক শর্ত পূরণ করা জরুরি। এর মধ্যে অন্যতম হলো বেসরকারি বিনিয়োগের মন্দাভাব দূর করা। উচ্চ সুদের হার, তীব্র জ্বালানি সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে অর্থ খাটানো কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২ শতাংশে এসে ঠেকেছে, যা ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তির জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে একেবারেই অপ্রতুল। এই স্থবিরতা কাটাতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো বাজেটের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, দ্রুত কাস্টমস ছাড়পত্র, বন্দর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে কার্যকর নীতি সহায়তা এখন সময়ের দাবি। তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের মতো উদীয়মান খাতগুলোকে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।

পাশাপাশি দেশের জ্বালানি খাতের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অসম্ভব। বর্তমানে জ্বালানির ঘাটতি ও চড়া মূল্য শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তাই শুধু নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বা সক্ষমতা বাড়ানোর সনাতনী চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, সিস্টেম লস কমানো এবং বিতরণ সংস্থাগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তা সরাসরি উৎপাদন খরচ কমাবে এবং বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে।

সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। ঢাউস আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নিলেই প্রবৃদ্ধি বাড়ে না, যদি না সেই প্রকল্পগুলো সময়মতো এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়।২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৩ লাখ কোটি টাকার ঢাউস আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের খরচসহ এর সার্বিক আকার দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
ধীরগতির ও কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে কৃষি, সেচ, কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা, পরিবহন ও স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো সরাসরি উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। বিশেষ করে মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ বাড়ানো এখন অপরিহার্য। তবে এই ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে সামাজিক অবকাঠামোর মান উন্নত হবে না। 

সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। প্রবৃদ্ধি কাগজের কলমে বাড়লেও যদি মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়, তবে সেই উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না। তাই আসন্ন বাজেটে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিশেষ কৌশল থাকতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, সার, জ্বালানি ও ওষুধের ওপর আমদানি শুল্ক পুনর্বিবেচনা করা দরকার, যাতে নতুন বাজেটের কারণে বাজারে পণ্যের দাম আর না বাড়ে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী মজুতদার ও কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে প্রস্তাবিত 'ফ্যামিলি কার্ড' বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও ভাতার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়াতে হবে। তবে এই সহায়তা যেন প্রকৃত অভাবী, প্রান্তিক কৃষক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের হাতে পৌঁছায়, সেজন্য একটি স্বচ্ছ ডিজিটাল ডাটাবেস ও পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

গ্রামীণ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শ্রমনির্ভর জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে নজর দিতে হবে। তরুণদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ডিজিটাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। তবে সরকার যদি এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা দেখায়, তবে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়বে এবং সুদের হার আরও বেড়ে যাবে। এতে হিতে বিপরীত হয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। তাই ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কর জালের সম্প্রসারণ, শুল্ক ফাঁকি রোধ এবং অপচয় কমানোর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং মহামারির পরবর্তী ধাক্কায় দেশে দারিদ্র্যের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বহু পরিবার এখন খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেট বর্তমান সরকারের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। এই বাজেটের সাফল্য কেবল এর বিশাল আকার বা কতগুলো মেগা প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হলো—তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং বাজেটটি কতটা কার্যকরভাবে সাধারণ মানুষের পকেটের ওপর চাপ কমাতে পারছে, বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—তার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে এর আসল কার্যকারিতা।

AHA
আরও পড়ুন