অতি ক্ষুদ্র সঞ্চয় থেকেও কর নিতে চায় সরকার

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

মাত্র ১০–২০ টাকা করে সঞ্চয় করেন—এমন সদস্যদের সঞ্চয়ের বিপরীতে পাওয়া সুদের ওপরও ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন উপ-কর কমিশনারের কার্যালয় থেকে এ কর আদায়ের জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে।

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সদস্যদের কাছ থেকে অল্প অল্প করে সঞ্চয় নেয় এবং সেই সঞ্চয়ের বিপরীতে নির্ধারিত হারে সুদ দেয়। বর্তমানে এসব সঞ্চয়ের ওপর সুদের হার ৬ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে। এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, সদস্যরা যে সুদ আয় করেন, সেখান থেকেই ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) ৩০ জুন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৩৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট সদস্য প্রায় ৪ কোটি ৭৩ লাখ। তাঁদের সঞ্চয়ের স্থিতি ৯৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতা সদস্য রয়েছেন ৩ কোটি ৬১ লাখ।

এনবিআর কর্মকর্তারা ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১০২(১) ধারার ভিত্তিতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিচ্ছেন। ওই ধারায় কোনো ব্যাংক, বিমা, লিজিং বা ফাইন্যান্স কোম্পানি, সমবায় কিংবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুদ বা মুনাফা দিলে তা পরিশোধের সময় উৎসে কর কাটার বিধান রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, কোম্পানি, ট্রাস্ট ও ব্যক্তিসংঘকে সুদ বা মুনাফা দেওয়ার ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটার বিধান রয়েছে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় রাখা সদস্যদের সুদ ‘অন্যান্য’ শ্রেণির মধ্যে পড়ছে। ফলে কোনো সদস্য ১০০ টাকা সুদ পেলে ১০ টাকা উৎসে কর হিসেবে কেটে তাঁকে ৯০ টাকা দেওয়ার কথা। বাকি ১০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান প্রযোজ্য বলে মনে করছে এনবিআর।

এনবিআরের চিঠিতে বলা হয়েছে, আয়কর আইনে সদস্যদের সঞ্চয়ের বিপরীতে দেওয়া সুদ থেকে উৎসে কর কাটার বিধান থাকলেও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন তা করেনি। ফলে এ খাত থেকে সরকারি কোষাগারে কোনো অর্থ জমা হয়নি।

এখন ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সদস্যদের দেওয়া সুদের ওপর প্রযোজ্য উৎসে কর একসঙ্গে জমা দিতে বলা হয়েছে। বিলম্বের জন্য ২ শতাংশ জরিমানাও দিতে হবে। এ-চালানের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের সঞ্চয়ের সুদের ওপর উৎসে কর আরোপ না করার দাবি জানিয়েছে ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। ২২ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এনবিআরের চেয়ারম্যান, পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান এবং এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করেছে সংগঠনটি।

সিডিএফ ১২৯টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের একটি নেটওয়ার্কিং সংস্থা। সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও পিপলস ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্টেশনের (পপি) নির্বাহী সচিব মুর্শেদ আলম সরকার বলেন, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা অনেক সময় মাত্র ১০–২০ টাকা করে সঞ্চয় করেন। এসব মানুষের সঞ্চয়ের সুদের ওপর কর আরোপ করা হলে তা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তাঁর মতে, সরকার যখন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে, তখন ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে উৎসে কর নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এতে দরিদ্র মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সিডিএফের আবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে সদস্যদের জমা রাখা সঞ্চয় শুধু অর্থ জমিয়ে রাখার বিষয় নয়; পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হলে, ফসল নষ্ট হলে কিংবা হঠাৎ আয় কমে গেলে এই অর্থ আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। সংগঠনটির মতে, অনেক ক্ষেত্রে এটি অনানুষ্ঠানিক বিমার মতো সহায়তা দেয়।

সংগঠনটি আরও বলেছে, সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় গ্রহণ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, সদস্যদের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত। আবার এমআরএ বিধিমালা, ২০১০ অনুযায়ী, আমানতের বিপরীতে নির্ধারিত সুদ পাওয়া সদস্যদের অধিকার।

সিডিএফের দাবি, এই কারণে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সুদ এতদিন করমুক্ত হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। নতুন করে উৎসে কর কাটার নির্দেশনা কার্যকর হলে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

সদস্যদের সঞ্চয়ের ওপর উৎসে করের নিয়ম প্রযোজ্য কি না, তা আয়কর আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই বলেও মনে করে সিডিএফ।

সংগঠনটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ খাতে মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ৭৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। এর ওপর গড়ে ৬ শতাংশ হারে সুদ দিলে মোট সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এই সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপ করা হলে বছরে করের পরিমাণ প্রায় ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা হতে পারে।

ক্ষুদ্রঋণ ও সঞ্চয় কার্যক্রম পরিচালনাকারী এনজিওগুলোর আয়কর নথি রয়েছে—এমন একটি কর অঞ্চলের কমিশনারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আয়কর আইনে আমানতের মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটার বিধান রয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে এ হার ১০ শতাংশ। সেই বিধান অনুযায়ী কর কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগ করছেন বলে তিনি জানান।

তাঁর আশঙ্কা, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসে কর জমা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের সুবিধা দাবি করতে পারে।

তবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক সঞ্চয়কারীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এমআরএ যদি এনবিআরের কাছে উৎসে কর থেকে ছাড় দেওয়ার সুপারিশ করে, সে বিষয়টি এনবিআর বিবেচনা করতে পারে বলেও জানান ওই কর কর্মকর্তা।

এদিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সুদের ওপর উৎসে কর আরোপের বিষয়টি নিয়ে এমআরএর অবস্থান এনবিআরের ব্যাখ্যার সঙ্গে এক নয়।

এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেছেন, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সুদের ওপর উৎসে কর প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে এমআরএ।

ফলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের সঞ্চয়ের সুদের ওপর উৎসে কর আদায়ের উদ্যোগকে ঘিরে এখন এনবিআর ও এমআরএর ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য দেখা দিয়েছে। একদিকে আয়কর আইনের বিদ্যমান বিধানের ভিত্তিতে কর আদায়ের উদ্যোগ চলছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের স্বার্থে এ কর প্রযোজ্য নয় বলে অবস্থান নিয়েছে এমআরএ। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন