আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব এবার সরাসরি বাংলাদেশের ভোক্তার ওপর পড়েছে। অক্টোবরের জন্য ১২ কেজি বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সেপ্টেম্বরের ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে এক লাফে এই বৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৯ শতাংশের বেশি। নতুন দাম ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
শুধু সরকারি নির্ধারিত দামই নয়, সরবরাহ সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাস্তবে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে ভোক্তাকে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অর্থাৎ কোথাও কোথাও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ টাকারও বেশি দিতে হচ্ছে।
প্রতিবেশীদের তুলনায় দাম বেশি
বাংলাদেশে অক্টোবর মাসে সরকারি দর প্রতি কেজি এলপিজি ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। অন্যদিকে ভারতের কলকাতায় ১৪ দশমিক ২ কেজির গৃহস্থালি সিলিন্ডারের দাম ৯৬৮ ভারতীয় রুপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ অক্টোবরের ক্রস রেট অনুযায়ী ১ ভারতীয় রুপি প্রায় ১ দশমিক ২৭৭ টাকা। সে হিসাবে কলকাতার এলপিজির দাম প্রতি কেজি প্রায় ৮৭ টাকা। অর্থাৎ সরকারি দরের হিসাবেই বাংলাদেশে প্রতি কেজি এলপিজি ভারতের কলকাতার তুলনায় প্রায় ৭৬ শতাংশ বেশি।
নেপালেও ১৪ দশমিক ২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বর্তমানে ২ হাজার ৬০ নেপালি রুপি। ১ নেপালি রুপি প্রায় ০ দশমিক ৮ টাকা ধরে হিসাব করলে সেখানে প্রতি কেজির দাম প্রায় ১১৬ টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশের ১৫৩ টাকা কেজির সরকারি দর নেপালের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি।
পাকিস্তানেও অক্টোবর মাসে এলপিজির দাম বেড়েছে। দেশটির তেল ও গ্যাস নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওগ্রা প্রতি কেজি এলপিজির দাম ২৭৯ দশমিক ৩৪ পাকিস্তানি রুপি নির্ধারণ করেছে; ১১ দশমিক ৮ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৯৬ দশমিক ২৩ রুপি। বর্তমান বিনিময় হারে এটি বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি কেজিতে প্রায় ১২৪ টাকা। অর্থাৎ পাকিস্তানের তুলনায়ও বাংলাদেশে সরকারি এলপিজির দর প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে
বাংলাদেশের নতুন দাম নির্ধারণের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ বড় ভূমিকা রেখেছে। বিইআরসি অক্টোবরের হিসাবের ক্ষেত্রে সৌদি আরামকোর কনট্রাক্ট প্রাইস বা Saudi CP-কে ভিত্তি ধরেছে। অক্টোবরে প্রোপেনের দাম প্রতি টন ৬৮০ ডলার এবং বিউটেন ৭৩০ ডলার ধরা হয়েছে। ৩৫ শতাংশ প্রোপেন ও ৬৫ শতাংশ বিউটেনের অনুপাতে গড় Saudi CP দাঁড়িয়েছে ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার প্রতি টন। সেপ্টেম্বরের গড় ছিল ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার। অর্থাৎ এক মাসে গড় আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৭৫ ডলার। এর সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন ও আমদানিকারকের প্রিমিয়ামও। সেপ্টেম্বরের মূল্য নির্ধারণে প্রতি টনে ১৬০ ডলার ধরা হলেও অক্টোবরে তা বাড়িয়ে ২৫০ ডলার করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু এই উপাদানেই হিসাবের খরচ বেড়েছে ৯০ ডলার প্রতি টন।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই চাপ যে শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য দেশেও পড়ছে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের জন্য সৌদি আরামকো প্রোপেনের OSP ৫৫ ডলার বাড়িয়ে ৬৮০ ডলার এবং বিউটেন ৭০ ডলার বাড়িয়ে ৭৩০ ডলার করেছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এলপিজি সরবরাহ চুক্তির ক্ষেত্রে এই দাম গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সরবরাহ সংকটেও বাড়ছে দাম
বাংলাদেশে সমস্যাটি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সেপ্টেম্বর থেকে এলপিজির সরবরাহ নিয়েও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। আমদানিকারক ও বিইআরসি সূত্র জানায়, আগস্টে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করলেও সেপ্টেম্বরে আমদানি নেমে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনে দাঁড়ায়, যা প্রায় ২৫ শতাংশ কম। এর ফলে সরকারি নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার বিপরীতে বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকার ওপরে উঠে যায়।
আমদানিকারকদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজি আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে অস্থিরতা, জাহাজের সংকট এবং বাড়তি পরিবহন ব্যয় সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে। কেউ কেউ বলেছেন, সরবরাহকারীরা চুক্তিবদ্ধ পরিমাণের পুরো এলপিজি দিতে পারছেন না। ফলে স্পট মার্কেটেও পণ্য পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
‘কৃত্রিম সংকটের’ অভিযোগ
এলপিজির বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সরকার ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য পুরোপুরি এক নয়। সেপ্টেম্বরে সরকার জেলা প্রশাসকদের কাছে এলপিজির ঘাটতি ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেয়। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোথাও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মজুত বা অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। অন্যদিকে LPG Operators Association of Bangladesh (LOAB)-এর একটি অংশ দাবি করেছে, সামগ্রিক আমদানিতে বড় ধরনের পতন হয়নি। তাদের হিসাবে সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি দেশে এসেছে, যা আগস্টের প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টনের কাছাকাছি। তারা আমদানিকারকভিত্তিক মজুত ও পণ্য ছাড়ার তথ্য তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
অর্থাৎ বাজারে সংকটের প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে- আন্তর্জাতিক সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়, আমদানির সময়সূচি, পণ্য খালাস ও বাজারে ছাড়ার গতি, নাকি কোথাও কৃত্রিম সংকট সবগুলো বিষয়ই তদন্তের আওতায় আসছে।
৯৮ শতাংশের বেশি বাজার বেসরকারি খাতনির্ভর
বাংলাদেশের এলপিজি বাজারের কাঠামোও ভোক্তার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দেশের বার্ষিক এলপিজি চাহিদা প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে টিবিএস জানিয়েছে। এর প্রায় ৯৯ শতাংশ সরবরাহ করে বেসরকারি কোম্পানি; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ খুবই কম। গৃহস্থালি রান্নায় মোট ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশ যায়।
অন্য একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় LP Gas Limited-এর ১২ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৭৭৭ টাকার মতো হলেও বাজারে তাদের অংশ এত কম যে ৯৮ শতাংশের বেশি বোতলজাত গ্যাসের ভোক্তা কার্যত বেসরকারি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ দাম বাড়া কিংবা আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব দ্রুত খুচরা বাজারে পৌঁছে যায়।
কর কাঠামো বদলালেও স্বস্তি আসেনি
এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার কর কাঠামোতেও পরিবর্তন এনেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড উৎপাদন ও বাণিজ্য পর্যায়ের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানির ২ শতাংশ অগ্রিম কর তুলে দিয়ে আমদানি পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে। এনবিআরের ভাষ্য ছিল, এতে ভোক্তার ওপর সামগ্রিক ভ্যাটের চাপ কমবে এবং বাজার স্থিতিশীল হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, জাহাজভাড়া ও আমদানিকারকের প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় সেই কর-সুবিধা বর্তমানে ভোক্তাকে বড় ধরনের স্বস্তি দিতে পারছে না।
বাজারদর বনাম সরকারি দর
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো সরকারি দাম ও বাস্তব বাজারদরের ফারাক। অক্টোবরের সরকারি দর ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি দরের তুলনায় বাজারে ভোক্তাকে প্রায় ২০ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দিতে হতে পারে। ফলে শুধু বিইআরসির নতুন মূল্য নির্ধারণই নয়, নির্ধারিত দরে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করাও এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিইআরসি জানিয়েছে, বোতলজাত এলপিজি, রেটিকুলেটেড এলপিজি ও অটোগ্যাস কোনো পর্যায়েই- সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ, পরিবহন, বিতরণ কিংবা খুচরা বিক্রিতে কমিশনের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা যাবে না।
সামনে আরও চাপের আশঙ্কা
অক্টোবরে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে শীতকাল সামনে আসায় বাজারে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির বেঞ্চমার্ক মূল্য ইতোমধ্যেই বেড়েছে, আর বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক বাজার ও নৌপথের পরিস্থিতির প্রভাব দ্রুত দেশের বাজারে আসে। একই সঙ্গে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির কারণে রান্না ও অন্যান্য কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না এলে ভোক্তার জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
চাকরিতে যোগ দেননি ১৪৭১, নিয়োগপত্র বঞ্চিত ৮৩ জন
খাবারে মরা ইঁদুর, ভিডিও ভাইরালের হুমকি দিয়ে ২৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি!
মধ্যরাতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়লো ঝলমল সিনেমা হলসহ ২০ দোকান
মধ্য এশিয়ায় কী ইরানের তেলের নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে?
যেসব শর্ত পূরণ করে পরিবার নিতে পারবেন সৌদি প্রবাসীরা
সৌদি আরবকে সর্বাত্মক সহায়তা করবে পাকিস্তান