এক রাতেই খরচ ২৬ লাখ টাকা! কী এমন সুযোগ-সুবিধা থাকবে প্রমোদতরীতে?

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম

টাইটানিকও যেন হার মানে বিলাসিতায়! এমনই এক প্রমোদতরী কয়েক মাসের মধ্যেই দাপিয়ে বেড়াবে পৃথিবীর সাত সমুদ্র। নাম ‘আমনগতি’। আরবি শব্দ ‘আমন’ অর্থ শান্তি, আর সংস্কৃত শব্দ ‘গতি’ মিলিয়ে রাখা হয়েছে এই নাম। অর্থ দাঁড়ায় ‘শান্তিপূর্ণ গতি’।

তবে নামের মধ্যে ভারতীয় ছোঁয়া থাকলেও ভারতের সঙ্গে এই বিলাসবহুল সমুদ্রযানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। রাশিয়ান মালিকানাধীন আমন গ্রুপ, সৌদি আরবের সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ক্রুজ সৌদি এবং নেদারল্যান্ডসের সিনোট ইয়ট আর্কিটেকচার যৌথভাবে তৈরি করছে এটি।

২০২৭ সালের মে মাসে সমুদ্রে যাত্রা শুরু করবে আমনগতি। তবে যাত্রা শুরুর আগেই বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে এসেছে এই সুপারইয়ট। কারণ, এখানে এক রাত কাটাতে সর্বোচ্চ খরচ হতে পারে ২৬ লাখ টাকা! আর সাধারণ স্যুটে এক রাতের সর্বনিম্ন খরচও প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা। অবশ্য এক রাতের জন্য বুকিং করা যাবে না; অন্তত তিন রাত থাকতে হবে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত বিপুল অর্থ খরচ করে এমন কী সুবিধাই বা মিলবে? আমনগতি কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি শুধু একটি বিলাসবহুল ইয়ট নয়; বরং সমুদ্রের বুকে তৈরি করা হচ্ছে ভাসমান এক অভিজাত অবকাশযাপন কেন্দ্র।

একজন অতিথির জন্য দুজন কর্মী

আমনগতির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য এর ব্যক্তিগত আতিথেয়তা। মোট ৪৭টি স্যুটে ৯৪ জন অতিথি থাকার ব্যবস্থা থাকবে। তাঁদের সেবায় থাকবেন ২০৭ জন কর্মী। অর্থাৎ প্রায় একজন অতিথির জন্য দুজনের বেশি কর্মী।

অতিথির ব্যাগ খুলে কাপড় গুছিয়ে রাখা থেকে শুরু করে ভ্রমণ শেষে আবার সবকিছু প্যাক করে দেওয়া এসব দায়িত্ব থাকবে ব্যক্তিগত হোস্টদের ওপর। কোনো কিছু প্রয়োজন হলে মুখ ফুটে বলারও অপেক্ষা নেই; ব্যক্তিগত বাটলার খাবার বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী হাজির করবেন অতিথির সামনে।

স্যুটেই ব্যক্তিগত শেফ ও বার

প্রিমিয়াম স্যুটগুলোর অতিথিদের জন্য থাকবেন ব্যক্তিগত রন্ধনশিল্পী। স্যুটে থাকা দুজন অতিথির পছন্দ, রুচি ও মেজাজ বুঝে তাঁদের জন্য খাবার তৈরি করবেন সেই শেফ। এর জন্য আলাদা অর্থও দিতে হবে না।

প্রতিটি স্যুটে থাকবে ব্যক্তিগত পানশালা। বিশ্বের নামী ব্র্যান্ডের পানীয় সেখানে সাজানো থাকবে। আর কেউ অ্যালকোহল পান না করলে তাঁর পছন্দ অনুযায়ী নানা ধরনের নন-অ্যালকোহলিক পানীয় তৈরি করে দেবেন বারটেন্ডার।

ঘরেই সনা, জাকুজি ও ব্যক্তিগত ডেক

প্রতিটি স্যুটে থাকবে ব্যক্তিগত সনা। বিশ্বমানের ওয়েলনেস থেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে শরীর ও মনকে সতেজ করার সুযোগ মিলবে সেখানে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়, এসব সুবিধা উপভোগ করা যাবে সমুদ্র ও খোলা আকাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে।

স্যুটের সঙ্গে থাকবে ব্যক্তিগত ডেক। সেখানে থাকবে জাকুজি বা হট টাব। ঈষদুষ্ণ পানিতে আরাম করে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সময় কাটানোর সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন হলে মৃদু ডাকেই হাজির হবেন ব্যক্তিগত সেবাকর্মী, হাতে থাকবে নরম তোয়ালে কিংবা পছন্দের পানীয়।

ঘরগুলোতেও থাকবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। আইপ্যাডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বিভিন্ন সুবিধা। এমনকি প্রয়োজনীয় কিছু গ্যাজেটও দেয়ালের ভেতর থেকে নিচে নেমে আসবে এক স্পর্শেই।

পরিবারের জন্য সমুদ্রের বুকে ‘ভিলা’

পরিবার নিয়ে ভ্রমণে গেলে আরও বিশেষ সুবিধা রয়েছে। প্রিমিয়াম ও ডিলাক্স স্যুট পাশাপাশি নিয়ে সেগুলোকে একত্র করে তৈরি করা যাবে একটি ফ্যামিলি ভিলা। ফলে অন্য অতিথিদের থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে পারবেন।

ইয়টের ভেতরেই আর্ট গ্যালারি ও লাইব্রেরি

শুধু থাকার ব্যবস্থা নয়, আমনগতিতে বিনোদন ও অবসর কাটানোর জন্যও থাকছে নানা আয়োজন। ইয়টের ভেতরেই থাকবে আর্ট গ্যালারি, যেখানে বিশ্বমানের শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য দেখার সুযোগ থাকবে।

থাকবে আন্তর্জাতিক ডিজাইনারদের পোশাকের বুটিক। বইপ্রেমীদের জন্য তৈরি করা হবে একটি আলিশান লাইব্রেরি। আর তরুণদের জন্য থাকবে অত্যাধুনিক গেমিং জোন ও নানা ধরনের প্রযুক্তি-গ্যাজেটে সাজানো ইয়ুথ লাউঞ্জ।

স্পা-তে গরম-ঠান্ডা পানির অভিজ্ঞতা

আমনগতির প্রায় ১ হাজার ১৯০ মিটারজুড়ে বিস্তৃত স্পা ও ওয়েলনেস সেন্টারও হবে এর অন্যতম আকর্ষণ।

এখানে থাকবে জাপানি দর্শনে তৈরি একটি প্লাঞ্জ পুল। একই ব্যবস্থায় পাশাপাশি থাকবে ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পানি এবং ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডা পানি। এছাড়া থাকবে তুর্কি হামাম ও রাশিয়ান বানিয়া স্টিম বাথ।

সবুজে ঘেরা সেরেনিটি গার্ডেন, ত্বকচর্চার জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং উচ্চমানের হেয়ার ও নেইল সেলুনও থাকবে এই স্পা-এ।

তিনটি পুল, তার মধ্যে দুটিই সমুদ্রের সঙ্গে

আমনগতিতে থাকবে মোট তিনটি পুল। এর মধ্যে দুটি হবে সমুদ্রের পানিতে অর্ধনিমজ্জিত সি-পুল। অন্যটি থাকবে খোলা আকাশের নিচে উত্তপ্ত নোনা পানির ইনফিনিটি পুল।

পুলের চারপাশে থাকবে আরামদায়ক সান লাউঞ্জার ও ডে-বেড। অতিথিরা সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে সেখানে সময় কাটাতে পারবেন। বিকেলে পরিবেশন করা হবে আফটারনুন টি। সূর্যাস্তের সময় মিলবে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ ড্রিঙ্কস ও বিভিন্ন ককটেল।

জ্যাজ ক্লাব থেকে তারার নিচে সিনেমা

বিনোদনের ব্যবস্থাতেও কমতি থাকছে না। থাকবে জ্যাজ ক্লাব, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করবেন।

ইনডোর থিয়েটারে সিনেমা দেখার সুযোগ তো থাকছেই। আবার কেউ চাইলে খোলা ডেকে তারাভরা আকাশের নিচেও সিনেমা দেখতে পারবেন।

এ ছাড়া থাকবে ফিটনেস স্টুডিও, যোগব্যায়াম, মেডিটেশন ও পাইলেটসের জন্য আলাদা জায়গা। ওয়াটার স্পোর্টসের পাশাপাশি ভার্চুয়াল গল্ফসহ বিভিন্ন খেলার ব্যবস্থাও থাকবে। অতিথিদের দ্রুত যাতায়াতের জন্য ইয়টে থাকবে দুটি হেলিপ্যাড।

চার রেস্তোরাঁ, সঙ্গে মিষ্টির আলাদা আয়োজন

খাবারের আয়োজনও হবে বেশ বৈচিত্র্যময়। আমনগতিতে থাকবে চারটি বিশেষ রেস্তোরাঁ—আলিরা, হিওরি, আকারি ও আমন গ্রিল। অতিথিরা সেখানে বিভিন্ন ধরনের খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন।

রেস্তোরাঁয় যেতে ইচ্ছা না করলে রয়েছে ব্যক্তিগত ডাইনিংয়ের সুবিধাও। শুধু মিষ্টি ও ডেজার্টের জন্য থাকবে আলাদা রেস্তোরাঁ। পাশাপাশি থাকবে একাধিক বার ও একটি সিগার লাউঞ্জ। সেখানে পাওয়া যাবে হাতে তৈরি বিভিন্ন প্রিমিয়াম সিগার এবং বিভিন্ন ধরনের মদ ও ওয়াইন।

তাহলে ২৬ লাখ টাকা কেন?

সব মিলিয়ে আমনগতি সমুদ্রের বুকে নির্মিত একটি ভাসমান বিলাসবহুল রিসোর্ট। ব্যক্তিগত বাটলার, শেফ, সনা, জাকুজি, স্পা, পুল, রেস্তোরাঁ, আর্ট গ্যালারি, লাইব্রেরি, জ্যাজ ক্লাব, থিয়েটার থেকে শুরু করে হেলিপ্যাড—একটি পাঁচতারকা রিসোর্টে যে ধরনের বিলাসিতা পাওয়া যায়, তার প্রায় সবই এখানে এক ছাদের নিচে, বরং এক ডেকের ওপর।

তাই প্রিমিয়াম আমন স্যুটে এক রাতের জন্য ২৬ লাখ টাকা খরচের খবর শুনে চোখ কপালে উঠলেও, আমনগতির সুযোগ-সুবিধার তালিকা দেখলে বোঝা যায় যাঁদের কাছে অর্থের চেয়ে একান্ত ব্যক্তিগত বিলাসিতা ও সমুদ্রের বুকে বিরল অভিজ্ঞতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের জন্যই তৈরি হচ্ছে এই ভাসমান রাজপ্রাসাদ।

এমএমজেড
আরও পড়ুন