আজকের এই সংযুক্ত বিশ্বব্যবস্থায় 'দুর্গম' শব্দটি যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু পৃথিবীর মানচিত্রের একদম উত্তর প্রান্তে গ্রিনল্যান্ডের একটি ছোট্ট গ্রাম 'ইতোকোর্তোরমিত' (Ittoqqortoormiit) আজও সেই দুর্গমতার সংজ্ঞা ধরে রেখেছে। বছরের নয় মাস বরফের চাদরে ঢাকা এই গ্রামটি যেন এক ভিন্ন জগতের গল্প শোনায়।
ইতোকোর্তোরমিত গ্রামে মাত্র ৩৭০ জন মানুষের বসবাস। বর্ণিল ঘরবাড়িতে সাজানো এই গ্রামটি বাইরের জগত থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন যে, এর নিকটতম শহরটির দূরত্বও প্রায় ৮০০ কিলোমিটার। এখানে কোনো পাকা সড়ক নেই। পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হলো হেলিকপ্টার কিংবা গ্রীষ্মের অল্প কদিন নৌকায় চড়ে। এছাড়া ৪০ কিলোমিটার দূরের নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দর থেকে সপ্তাহে মাত্র দুইবার ফ্লাইট চলাচলের সুযোগ রয়েছে।
গ্রামের প্রধান বাসিন্দা আদিবাসী 'ইনুইট' গোষ্ঠী। তাদের জীবনযাত্রা এখনো হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে। যাতায়াতের প্রধান বাহন হলো কুকুরে টানা স্লেজ। এই স্লেজ টানার কুকুরগুলোকে তারা বলে 'কিম্মিত'। প্রায় এক হাজার বছর আগে সাইবেরিয়া থেকে আসা এই কুকুরগুলো এখন গ্রিনল্যান্ডের জাতীয় প্রতীক। একেকটি স্লেজে ১২টি কুকুর প্রায় ৪৫০ কেজি ওজন নিয়ে প্রতিদিন ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়াতে পারে।
আলোকচিত্রী কেভিন হল জানান, তার এই সফর ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতার একটি। মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে তুষারঝড় আর ঘণ্টায় ৮০ মাইল বেগের বাতাসের সাথে লড়াই করে তাকে টিকে থাকতে হয়েছে। রাতের খাবারে ছিল বরফে জমে যাওয়া কড মাছ সেদ্ধ। খোলা তাঁবুতে ঘুমানোর সময় প্রবল বাতাসের ঝাপটা আর চারপাশের বন্যপ্রাণীর ডাক এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করত।
এই অঞ্চলের বরফময় পাহাড়গুলোতে বাস করে বিশালাকার মাস্ক অক্স (Musk Ox) এবং পোলার বিয়ার বা মেরুভালুক। প্রায় ৪০০ কেজি ওজনের মাস্ক অক্সগুলোকে দেখতে যেমন প্রাগৈতিহাসিক, তেমনি তারা বেশ আক্রমণাত্মকও হতে পারে। ইনুইটদের জন্য এই প্রাণীগুলো ঐতিহাসিকভাবে খাদ্যের উৎস হলেও বর্তমানে শিকারের ওপর কঠোর আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শিকার করা মাংস বা চামড়া তারা কেবল নিজেদের পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন।
২০২৫ সালে গ্রামটি তার শতবর্ষ পূর্ণ করলেও বর্তমানে এটি দুটি বড় সংকটের মুখোমুখি—জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনশূণ্যতা। ২০০৬ সালের পর থেকে এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে। তরুণ প্রজন্ম আধুনিক জীবন আর শিক্ষার খোঁজে শহরমুখী হচ্ছে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সাগরের বরফ আগের চেয়ে দ্রুত গলে যাচ্ছে, যা ইনুইটদের ঐতিহ্যবাহী শিকারনির্ভর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ইতোকোর্তোরমিত কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি মানুষের টিকে থাকার এক অদম্য প্রতীক। চরম প্রতিকূলতার মাঝেও প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে ইনুইটরা যেভাবে তাদের শিকড় ধরে রেখেছে, তা আধুনিক বিশ্বের মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর শিক্ষা।
পর্যটনের নতুন দিগন্ত আফ্রিকার ‘স্লিপিং বিউটি’ আলজেরিয়া
পর্যটকদের কাছে কেন এখনও ‘অচেনা’ বাংলাদেশ
