ট্রাম্প-নেতানিয়াহু তিক্ততা: সংকটে তেহরান শান্তি আলোচনা

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০৬:২৮ এএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার একটি সাম্প্রতিক ফোনালাপকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান শান্তি আলোচনা গভীর সংকটে পড়েছে।

লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান নিয়ে দুই নেতার মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে, যা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়ানোর মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিল।

ফোনালাপে ‘অকৃতজ্ঞতার’ অভিযোগ ও ট্রাম্পের স্বীকারোক্তি

গত সোমবার (১ জুন) এক ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সূত্রমতে, ট্রাম্প ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন এবং তার বিরুদ্ধে ‘অকৃতজ্ঞতার’ অভিযোগ তোলেন।

বুধবার (৩ জুন) মার্কিন পডকাস্ট ‘পড ফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি এই তিক্ততার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন:

"হ্যাঁ, আমি কথাগুলো বলেছিলাম। তবে আমি রাগান্বিত ছিলাম না, বরং লেবাননে তার (নেতানিয়াহু) অনবরত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মনোভাব দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলাম।"

অবশ্য ট্রাম্প যোগ করেন যে, নেতানিয়াহুকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন এবং তার সঙ্গে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা ভালো।

নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া: ‘পারিবারিক মতবিরোধ’

অন্যদিকে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এই টানাপোড়েনের খবরকে কূটনৈতিকভাবে মৃদুভাবে উড়িয়ে দিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি (CNBC)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, "একটি ভালো পরিবারেও মাঝেমধ্যে কৌশলগত মতবিরোধ হয়। আমরা সবসময়ই ভালো বন্ধু হিসেবে এগুলো সমাধান করে নিই।" 

তিনি মন্তব্য করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সকালে কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলেও বিকালের মধ্যেই তা মিটে যায়।

সংকটের নেপথ্যে: ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের সামরিক লক্ষ্যের ভিন্নতা

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফোনালাপের নেপথ্যে রয়েছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের ভিন্নতা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলার প্রায় ১০০ দিন পার হওয়ার পর এই কৌশলগত দূরত্ব এখন স্পষ্ট হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য: মার্কিন প্রশাসন বর্তমানে ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি চুক্তি বজায় রাখতে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালি' উন্মুক্ত রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।

ইসরাইলের লক্ষ্য: ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে অনবরত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরানের হুঁশিয়ারি: তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধ ও যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের শান্তি আলোচনায় বসবে না।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইসরাইল নীতি নিয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে।

জনমত জরিপ: পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research Center) সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।

প্রশাসনের ভেতরে ক্ষোভ: ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক জাতীয় কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের প্রধান জো কেন্ট গত মার্চ মাসে পদত্যাগ করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, মার্কিন প্রশাসন ইসরাইলি লবির চাপেই এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, আসন্ন নির্বাচন ও অভ্যন্তরীণ জনমত ধরে রাখতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নেতানিয়াহুর থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?

ইতিহাস বলছে, নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। এর আগে বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা এবং জো বাইডেনের সঙ্গেও বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে তার তীব্র মতবিরোধ হয়েছিল। তবে ট্রাম্পের বিগত মেয়াদে নেতানিয়াহুর সম্পর্ককে বরাবরই সবচেয়ে উষ্ণ ধরা হতো এবং নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ‘হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে বড় বন্ধু’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

বর্তমান এই ফোনালাপের তিক্ততা ও মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখন জোর আলোচনা চলছে। সূত্র: বিবিসি

HN
আরও পড়ুন