ভোট পুনঃগ্রহণের দাবিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় বিক্ষোভ

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ১১:০৩ পিএম

দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় নির্বাচনে  ব্যালট ঘাটতির কারণে দেশের বহু নাগরিক ভোট দিতে না পারায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। এই সপ্তাহের স্থানীয় নির্বাচন বাতিল করে তা পুনরায় আয়োজনের দাবিতে রাজধানী সিউলের একটি ভোট গণনা কেন্দ্রের সামনে সমবেত হয়ে ৬,০০০-এরও বেশি মানুষ এক বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন।

শুক্রবার (৫ জুন) রাতে সিউলের এসকে অলিম্পিক হ্যান্ডবল স্টেডিয়ামে এই বিক্ষোভ সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে গত বুধবার অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনের ভোট গণনা চলছিল। উল্লেখ্য, এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেয়র, প্রাদেশিক গভর্নর, কাউন্টি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পরিষদের সদস্যদের বেছে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোটের দিন চরম অব্যবস্থাপনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ জনতা ভোট গণনা কেন্দ্রের সামনে জড়ো হতে শুরু করে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীরা জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে স্টেডিয়ামের চারপাশে অবস্থান নেন। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডগুলোতে লেখা ছিল, 'নির্বাচন পুনরায় হোক!'। গভীর রাত পর্যন্ত চলা এই বিক্ষোভে জনতা স্লোগানে স্লোগানে পুরো এলাকা কাঁপিয়ে তোলে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়াদের মধ্যে একটি বড় অংশই ছিলেন তরূণ প্রজন্ম। মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে ভোটের অব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নানা তথ্য ও ভিডিও দেখার পর তারা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সিউলের ২১ বছর বয়সী এক বাসিন্দা লি উং-ইয়ং বলেন, তিনি ইন্টারনেটে সরাসরি নির্বাচনের খবর দেখছিলেন। যখন তিনি জানতে পারেন যে ব্যালট পেপারের সংকটের কারণে শত শত মানুষকে ভোট না দিয়েই ফিরে যেতে হয়েছে, তখন এটি তার কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য মনে হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই বিষয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ও দায়সারা। একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করে ৩০ বছর বয়সী আরেক বিক্ষোভকারী পার্ক গুই-নাম বলেন, যোগ্য নাগরিকদের ভোট দিতে না দেওয়া সরাসরি ভোটাধিকার লঙ্ঘনের শামিল এবং এর জন্য কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে হবে।

এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই চরম বিশৃঙ্খলা এবং তীব্র গণ-অসন্তোষের মুখে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছে প্রশাসন। ভোটগ্রহণে ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান রোহ তাই-আক। সুপ্রিম কোর্টের এই বিচারপতি, যিনি দেশটির ঐতিহ্য অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন, তিনি অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এমন একটি বড় ব্যর্থতার পেছনে কোনো অজুহাত থাকতে পারে না। এটি জনসাধারণের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে এবং দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের যে আস্থা ছিল, তা ধূলিসাৎ করে এক গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। তিনি আরও জানান যে, এই পুরো সংকটের কারণ খতিয়ে দেখতে এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বাইরের নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল গঠনের অনুরোধ করা হবে এবং তিনি নিজে সেই প্যানেলের যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন।

পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের নীতি অফিসের প্রধান ইয়ুন জায়ে-সু এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি স্বীকার করেন যে, সারা দেশের মোট ১৪,৩০০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫০টিতে ব্যালট পেপার সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে নতুন করে ব্যালট পেপার সরবরাহ করতে দেরি হওয়ার কারণে অন্তত ২২টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সাময়িকভাবে পুরোপুরি স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। তবে এই সংকটের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এক অদ্ভুত হিসাব তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত সপ্তাহে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত আগাম ভোটে ভোটারদের অভূতপূর্ব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল।

সেই হিসাবের ওপর ভিত্তি করে কর্তৃপক্ষ বুধবারের মূল নির্বাচনের জন্য মোট যোগ্য ভোটারের মাত্র অর্ধেক বা ৫০ শতাংশের সমপরিমাণ ব্যালট পেপার ছাপিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, তিন দিনের মোট ভোটগ্রহণ মিলিয়ে যোগ্য ভোটারদের ৭৩ শতাংশের জন্য ব্যালটের ব্যবস্থা ছিল, যেখানে চূড়ান্ত ভোটদানের হার ছিল ৬৩ শতাংশ। কিন্তু জেলাভিত্তিক ভোটারদের সঠিক বিন্যাস ও চাহিদা মূল্যায়ন করতে না পারার কারণে অনেক কেন্দ্রে ব্যালটের তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়।

কমিশনের এমন পরিকল্পনাহীনতার কারণে বুধবার ভোটগ্রহণের দিন সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। সেদিন বিকেল ৬টায় ভোটগ্রহণের আনুষ্ঠানিক সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও বহু কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার জন্য মানুষ রাতভর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। সিউলের সংপা জেলার একটি কেন্দ্রে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিক্ষুব্ধ জনতা কর্মকর্তাদের ব্যালট বাক্স সিলগালা করে স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতে বাধা দেয়।

বিক্ষোভকারীরা শুক্রবার সকাল পর্যন্ত টানা বৃষ্টির মধ্যেও সেই ব্যালট বাক্সগুলো পাহারা দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক রূপ নেয় যে, শেষ পর্যন্ত শুক্রবার বিকেলে শত শত পুলিশ সদস্যকে ব্যালট বাক্স উদ্ধারের জন্য অভিযানে নামতে হয়। পুলিশ বেষ্টনী তৈরি করে কমিশনের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শেষ দুটি ব্যালট বাক্স উদ্ধার করে গণনা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পরই কেবল সেখানে ভোট গণনা শেষ করা সম্ভব হয়।

আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে দক্ষিণ কোরিয়ার শাসনব্যবস্থা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত উন্নত মনে করা হলেও, এবারের এই ঘটনা দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক অদূরদর্শিতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। নির্বাচন কমিশন প্রধানের পদত্যাগ এবং সরকারের নীরবতার মধ্যেই দেশজুড়ে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট সহজে কাটবার নয় এবং এর রেশ আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

AS
আরও পড়ুন