ফ্রান্সে আয়োজিত ঐতিহাসিক 'ডি-ডে' (D-Day) বার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় অভিবাসন ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের উপকূলে যা ঘটছে তাকে এক প্রকার অনুপ্রবেশ হিসেবে প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।
১৯৪৪ সালে নাৎসিদের কবল থেকে ইউরোপকে মুক্ত করতে মিত্রবাহিনী ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে অবতরণ করার ঠিক ৮২ বছর পর, সেই একই স্থানে দাঁড়িয়ে হেগসেথ এই বক্তব্য দিলেন।
ভাষণ দেওয়ার সময় পিট হেগসেথ বলেন, "দুঃখের বিষয় হলো, আজ ইউরোপের বিভিন্ন সৈকতে ভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক আদর্শের অনুপ্রবেশ ঘটছে। স্পেন, ইতালি, গ্রিস এবং বুলগেরিয়ার সৈকতগুলোতে নৌকা ও মানুষ এসে পৌঁছাচ্ছে। ইউরোপীয় রাজধানীগুলো কবে এই অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে?"
বর্তমানে অভিবাসন পুরো ইউরোপজুড়ে একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, যার ফলে কট্টর অভিবাসন নীতির পক্ষে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা জরিপে ব্যাপক বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসনও তাদের অভ্যন্তরীণ নীতির একটি অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে অভিবাসনবিরোধী কড়াকড়িকে দেখছে এবং এর জন্য ইনফোর্সমেন্ট সংস্থাগুলোর পেছনে শত শত কোটি ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দের আবেদন করেছে। ইউরোপের অভিবাসন নীতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক সমালোচনারই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে হেগসেথের এই মন্তব্যকে।
এর আগে গত শুক্রবার মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাউদাম্পটনে ভিক্রাম দিগওয়া নামের এক ব্যক্তির ছুরিকাঘাতে ১৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ ছাত্র হেনরি নোয়াকের ত্যুর ঘটনাটির জন্য "অভিবাসীদের ব্যাপক অনুপ্রবেশকে" দায়ী করেছিলেন। এর জবাবে যুক্তরাজ্যের ডাউনিং স্ট্রিট (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) থেকে বলা হয়, কিছু মানুষ তাদের গণতন্ত্রে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে। নোয়াকের পরিবারও স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তারা চান না এই মৃত্যুকে আরও বিভেদ সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করা হোক। উল্লেখ্য, ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস নিশ্চিত করেছে যে হামলাকারী দিগওয়া জন্মসূত্রে একজন ব্রিটিশ নাগরিক।
ফ্রান্সে বক্তব্য দেওয়ার সময় হেগসেথ আরও বলেন, ডি-ডে'র পর থেকে গত কয়েক বছরে কিছু ইউরোপীয় রাজধানী তাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা নিয়ে বড্ড বেশি "আরামদায়ক বা আয়েশি" হয়ে পড়েছে, তারা ভুলে গেছে যে "স্বাধীনতা বিনামূল্যে মেলে না"।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নৌ-সামরিক অভিযান হিসেবে পরিচিত এই ডি-ডে'তে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার হাজার হাজার সেনা নরম্যান্ডির পাঁচটি পৃথক সৈকতে একযোগে অবতরণ করেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এর আগে ইউরোপের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে জাতিসংঘে বলেছিলেন, "অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের" কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো নরকে যাচ্ছে। এর জবাবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের বক্তব্যকে "সঠিক নয়" বলে উল্লেখ করেন, তবে ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়া অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলার চ্যালেঞ্জকে মেনে নেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ইউরোপে সমুদ্রপথে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষাধিক মানুষের আগমন ঘটেছিল। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে যুক্তরাজ্য, গ্রিস, ইতালি, স্পেন ও সাইপ্রাসে সমুদ্রপথে মোট ১,৬৯,৩৪১ জন এসেছে, যার ২৩ শতাংশ ছিল যুক্তরাজ্যে। আবার ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ জুন পর্যন্ত ৯,১৪২ জন মানুষ ছোট নৌকায় ফ্রান্স থেকে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৮% কম।
গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসনের উন্মোচিত নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে দাবি করা হয়েছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০ বছর বা তার কম সময়ের মধ্যে ইউরোপকে চেনা যাবে না এবং এর অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো "সভ্যতার বিলুপ্তির" বাস্তব আশঙ্কার কাছে ম্লান হয়ে যাবে। দেশের অভ্যন্তরেও ট্রাম্প প্রশাসন তাদের এজেন্ডার প্রধান ভিত্তি হিসেবে অভিবাসনবিরোধী নীতিকে বেছে নিয়েছে, যার ফলে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস ইনফোর্সমেন্ট হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। সূত্র: বিবিসি
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ১০০ দিন: আলোচনা কোন পর্যায়ে?